কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করতে পারে

রয়টার্সের বিশ্লেষণ

কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করতে পারে

ফন্ট সাইজ:

ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে মূলত দেশটির নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে। এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই হামলা নিরাপত্তা হুমকি শেষ করবে এবং ইরানিদের জন্য তাদের শাসকদের উৎখাত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই হামলার কারণে পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোতে উত্তেজনা বেড়েছে। জবাবে ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়েছে ইরান। এর ফলে কীভাবে এই সংঘাত বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে পারে তা তুলে ধরে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তেলের দাম বৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনার মূল সূচক হলো তেল। ইরান একটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। হরমুজ প্রণালীর বিপরীত পাশে তার অবস্থান। এই প্রণালীর মাধ্যমে প্রায় ২০ শতাংশ বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ যায়। সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ সীমিত হতে পারে এবং তার ফলে দাম বাড়তে পারে। ব্রেন্ট ক্রুড শুক্রবার প্রায় ৭৩ ডলার প্রতি ব্যারেল দরে লেনদেন হচ্ছিল। যা এই বছরে ইতিমধ্যেই পঞ্চমাংশ বেড়েছে। হামলার কারণে কিছু বড় তেল কোম্পানি এবং শীর্ষ ট্রেডিং হাউস হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেল ও জ্বালানির সরবরাহ স্থগিত করেছে। চারটি ট্রেডিং সূত্র শনিবার এ বিষয়টি জানিয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান উদীয়মান বাজার অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন বলেন, সংঘাত সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্রেন্টের দাম প্রায় ৮০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে, যা গত বছরের জুনে ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধে সর্বোচ্চ ছিল। দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত সরবরাহে প্রভাব ফেললে তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলারে উঠতে পারে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে প্রায় ০.৬-০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে। একথা তিনি একটি নোটে লিখেছেন জ্যাকসন।

বাজারে উত্থান-পতন

সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে, যা ইতিমধ্যেই এ বছর ট্রাম্পের শুল্ক ও প্রযুক্তি শেয়ারের বড় বিক্রির কারণে ওঠানামা করেছে। ভিআইএক্স ভোলাটিলিটি সূচক এই বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড ভোলাটিলিটি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মুদ্রা বাজারও অজানা নয়। জুনের যুদ্ধে ডলার সূচক প্রায় ১ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু তা তিন-চার দিনের মধ্যে পুনরায় বাড়ে। সিবিএ বিশ্লেষকরা এক নোটে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে, পতনের পরিমাণ নির্ভর করবে সংঘাত কত বড় এবং কত সময় স্থায়ী হবে তার ওপর। যদি সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী হয় এবং তেলের সরবরাহ ব্যাহত করে, আমরা আশা করি যুক্তরাষ্ট্রের ডলার বেশিরভাগ মুদ্রার তুলনায় উঁচুতে থাকবে, কেবল জাপানি ইয়েন এবং সুইস ফ্রাঙ্ক বাদে। যুক্তরাষ্ট্র একটি নেট শক্তি রপ্তানিকারক এবং ব্যাহত তেল সরবরাহ থেকে তেলের দাম বাড়লে উপকৃত হবে। ইসরাইলের শেকেলও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। জুনের যুদ্ধে এটি ৫ শতাংশ কমেছিল এবং ইসরাইল ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দামেস্কে ইরানের দূতাবাসে আঘাত হানার পর এবং অক্টোবর মাসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময়ও প্রভাবিত হয়েছিল। সব ক্ষেত্রে পতন সাময়িক ছিল এবং শেকেল দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছিল। তবে, জেপি মরগ্যান বলেছে, যদি সংঘাত এবং বাজার ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট ব্যাংক বলেছে, বিশেষত যদি ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষ ইরানের প্রোক্সি বাহিনীর বিরুদ্ধে আরও তীব্র অভিযান শুরু করে তাহলে এই ঝুঁকি বাড়বে।

নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে আগ্রহ

সংকটকালে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে সুপরিচিত সুইস ফ্রাঙ্ক আরও চাপের মুখে পড়তে পারে, যা সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। এটি এই বছরে ডলারের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে আরও ঝুঁকতে পারে। ২০২৬ সালে ইতিমধ্যেই স্বর্ণের দাম ২২ শতাংশ বেড়েছে। রূপার দামও ইতিমধ্যেই উত্থানে রয়েছে। সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাও বাড়াতে পারে, যার রিটার্ন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হ্রাস পেয়েছে। বিটকয়েন এখানে ব্যতিক্রম, যা আর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হয় না। এটি শনিবার ২ শতাংশ কমেছে এবং দুই মাসে এর মূল্য প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে।

মধ্যপ্রাচ্য বাজারের দিকে নজর

রোববার মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে, বিশেষত সৌদি আরব এবং কাতারে লেনদেন, বিনিয়োগকারীর মনোভাবের প্রাথমিক ইঙ্গিত দেবে। যদিও এই বাজারগুলো তেলের দামের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, সংঘাত বাড়লে অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়তে পারে। নিওভিশন ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সিইও ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা রায়ান লেম্যান্ড বলেন, যদি এই শত্রুতা চলতে থাকে, আমি মনে করি বাজারে পতন হবে। সংঘাতের মাত্রার উপর নির্ভর করে, গালফের শেয়ার বাজার ৩-৫ শতাংশ কমতে পারে। সৌদি আরবের মূল শেয়ার সূচক বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে ১.৩ শতাংশ কমেছে, যা ধারাবাহিক দ্বিতীয় সপ্তাহের পতন।

বিমান ও প্রতিরক্ষা শেয়ার

শনিবার মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বৈশ্বিক বিমান সংস্থা বিমানের ফ্লাইট বাতিল করেছে। যদি সংঘাত বৃদ্ধি পায় এবং আরও আকাশসীমা বন্ধ হয়, তাদের শেয়ার চাপের মুখে পড়তে পারে। বছরের শুরু থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারকরা আরও চাহিদার মুখোমুখি হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন