ঢাকা-দিল্লির জমাট বরফে কূটনীতির উষ্ণতা

ঢাকা-দিল্লির জমাট বরফে কূটনীতির উষ্ণতা

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির আকাশে অবিশ্বাসের কালো মেঘ যখন ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক করিডোরে দেখা গেছে ভিন্ন আবহ ও উষ্ণতার বার্তা। গভীর টানাপোড়েন এবং নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা তৎপরতা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক নতুন মোড় উন্মোচন করেছে। ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর হাসোজ্জ্বল দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ এবং এর পরপরই নয়া দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক—দুই দেশের জমাট বরফ গলানোর সংকেত দিচ্ছে।

একই সঙ্গে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (‘র’)-এর প্রধান পরাগ জৈনের আকস্মিক ঢাকা সফর এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক নিছক কোনো প্রথাগত সফর নয়। পরিবর্তিত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার অবস্থান, সীমান্ত নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলগত সমীকরণ এবং পারস্পরিক স্বার্থকে নতুন করে সাজানোর তাগিদ থেকেই উভয় পক্ষ আজ মুখোমুখি বসেছে। ‘হাসিনা কার্ড’ বা একমুখী প্রভাবের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দুই দেশ কি একটি সার্বভৌম ও টেকসই সমতার সম্পর্কে প্রবেশ করতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক সংকটের মূল উৎস ভারতে আশ্রয় নেয়া পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অবস্থান এবং রাজনৈতিক তৎপরতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকে তার উপস্থিতি ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে সরাসরি অডিও বার্তার মাধ্যমে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিষোদগার ঢাকায় নজিরবিহীন ক্ষোভের সঞ্চার করে।

বাংলাদেশ সরকার আগেই সতর্ক করলেও দিল্লির মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে এই ধরনের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়াকে ঢাকা জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখেছে। কড়া প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অপরদিকে ঢাকার অকল্পনীয় দৃঢ় অবস্থানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (সাউথ ব্লক) এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানায় যে, শেখ হাসিনার সেই বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের নীতি বা অবস্থানের কোনো সম্পর্ক নেই। সাউথ ব্লকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে যা বলা হয়েছে, ভারত তা সমর্থন করে না।

দিল্লির এই অবস্থান পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘হাসিনা কার্ড’ আঁকড়ে রাখা ভারতের আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের জোর তৎপরতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ভারতে নিযুক্ত মন্ত্রী পদমর্যাদার সিনিয়র কূটনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করে সরাসরি দিল্লিতে গিয়ে মোদির মুখোমুখি হন। অন্যদিকে, ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণে ‘র’ প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক সম্পন্ন করেন।

গোয়েন্দা প্রধানের সফর এবং হাইকমিশনারের দৌড়-ঝাঁপকে পাশাপাশি রাখলে তিনটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়:

১.সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, উগ্রবাদ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপদ রাখতে পারবে না—এই সত্য দিল্লি পুনরায় উপলব্ধি করছে।

২.কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক নীতি পরিচালনা না করে, বাংলাদেশে জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা।

৩.শেখ হাসিনাকে কেন্দ্রে রেখে চিরস্থায়ী বৈরিতা তৈরি না করে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে সীমিত করা কিংবা আইনি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী একটি সমাধান খুঁজে বের করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের গভীরতা বোঝার জন্য মানচিত্রের দিকে তাকানো আবশ্যক। চাইলেই প্রতিবেশীকে পরিবর্তন করা যায় না। আবার বৈরিতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে শান্তিতে থাকাও সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য যতখানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, ঠিক তেমনই ভারতের সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা অপরিহার্য।
রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও সম্প্রতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ কিংবা জ্বালানি খাতের সহযোগী পাইপলাইন চালুর ক্ষেত্রে যেভাবে যোগাযোগ বজায় ছিল—তা প্রমাণ করে দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কতটা গভীর।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সর্বগ্রে’। আজকের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেই একই প্রজ্ঞাবান ও স্বাধীন পথেই হাঁটছে।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চোখ বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের ওপর। চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশগ্রহণ এবং ভারতের ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত অবস্থান—সব মিলিয়ে ঢাকা এখন এক কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে।

‘Bangladesh First’ নীতির মূল পরীক্ষাই হলো কোনো শক্তির কাছে নতজানু না হয়ে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে নিজের স্বার্থ আদায় করে নেয়া।

দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের বুঝতে হবে—ঢাকা আজ আর একমুখী প্রভাবের কোনো অঞ্চল নয়। বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনগণই ভারতের প্রকৃত বন্ধু, কোনো একক ব্যক্তি বা সাবেক স্বৈরাচার নয়।
কূটনৈতিক টেবিলে ভারতের আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্বের সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনই আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দ্বিমুখী নীতি ও অন্ধ ভারত-বিরোধিতার অপচর্চা বন্ধ করাও সমান জরুরি বলে আমি মনে করি।

আমাদের দেশের একশ্রেণির অন্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ও কিছু বক্তাদের মধ্যে যে বিষাক্ত প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখা যায়, তা আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।

প্রায়ই দেখা যায় যে কিছু ব্যক্তি জনসভায় সস্তা তালি পেতে চরম ভারত-বিরোধী উসকানিমূলক বার্তা দেন। অথচ তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত জীবনে ভারতীয় পণ্যের ব্যবহার, সংস্কৃতি বা গানের সুর অনুসরণের অন্ধ দ্বিমুখী আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আধুনিক পৃথিবীর কঠোর বাস্তবতায় আবেগ বিক্রি করে ধর্ম বা রাজনীতি করার সময় পার হয়ে গেছে। খেটে খাওয়া যে সাধারণ মানুষ দিন এনে দিন খায়, তাদের রান্নাঘরে আগুন জ্বালানো ও জীবনযাত্রাকে সহজ করার জন্য আবেগহীন, বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রয়োজন। এখানে রাজনৈতিক ভণ্ডামির কোনো সুযোগ নেই।

‘র’ প্রধানের সফর এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা হয়তো রাতারাতি সব সমস্যার জাদুকরী সমাধান এনে দেবে না। কিন্তু এটি দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের মনে একটি কঠিন সত্য স্পষ্ট করে দিয়েছে—বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ‘হাসিনা কার্ড’ দিয়ে নতুন ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, বৈরিতা বাড়িয়ে কোনো দেশ নিরাপদ থাকতে পারে না। বাংলাদেশ ভারতের কাছে চায় সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক সম্মান; আর ভারত চায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। আজ সময় এসেছে সমতা ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে পুরনো ভুলের কালো মেঘ সরিয়ে নতুন সোনালী রোদের আলো ছড়িয়ে দেয়ার। সুতরাং সচিবালয় থেকে শুরু হওয়া এই আস্থার বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক দুই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন ও হৃদয় জুড়ে। শান্তিকামী প্রতিটি মানুষের এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]