সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে রিয়াদ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সম্পর্কে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বাইরে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে রিয়াদ এগোচ্ছে কিনা- এ নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়িয়েছেন সৌদি ও আমিরাতি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিটি নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী আমিরাতি ভাষ্যকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন, সৌদি আরব কি জিসিসির বাইরে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে?
জিসিসি হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি জ্বালানি-সমৃদ্ধ রাজতন্ত্র- বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক জোট।
সমালোচনার সামনে রয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা আবদুলখালেক আবদুল্লাহ। তিনি একাধিক পোস্টে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
একটি পোস্টে আবদুল্লাহ লিখেন, নতুন জোট গঠনের জন্য অভিনন্দন। তবে তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং ‘উপসাগরীয় ঐক্য’ সুসংহত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান-ইসরাইল হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে- এমন দেশগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতায় বিনিয়োগের চেয়ে এটিই বেশি জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যেকোনো জোট সফল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো অভিন্ন শত্রু নির্ধারণ করা। তাহলে এই জোটের দেশগুলোর শত্রু কে?
তার মন্তব্যের দ্রুত জবাব দিয়েছেন সৌদি প্রিন্স আবদুর রহমান বিন মুসাইদ। তিনি বলেন, চুক্তিটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয় এবং রিয়াদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন ইউএইর শিক্ষাবিদ মহল এতটা উদ্বিগ্ন- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে প্রিন্স আবদুর রহমান লিখেন, এটি জোট, চুক্তি কিংবা অন্য যে নামেই হোক- সমস্যা কোথায়? তার প্রশ্ন, এটি কীভাবে ‘উপসাগরীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে? কোনো দেশ তার জাতীয় স্বার্থে অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি করার অধিকার রাখে না কি?
আসবার সেন্টার ফর স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ফাহাদ আল-আরাবি আল-হারথিও চুক্তিটির পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, মক্কা চুক্তি কারও বিরুদ্ধে গঠিত কোনো ‘জোট’ নয়। কারণ, এর ভিত্তি কোনো অভিন্ন শত্রু নির্ধারণ করা নয়; বরং যেকোনো পক্ষের সম্ভাব্য হুমকির মুখে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন সৌদি ব্যবহারকারী আরও কড়া ভাষায় আমিরাতের সমালোচনা করেন। এক মন্তব্যে প্রশ্ন করা হয়, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের আগে ইউএই কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে জানিয়েছিল?
ওই মন্তব্যে বলা হয়, ইসরাইলের সঙ্গে ইউএইর সম্পর্ক স্থাপনের আগে তারা কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে অবহিত করেছিল?
বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর আবদুল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন একটি বক্তব্য দেন, যা অনেকেই প্যান-ইসলামিক বা ত্রিপক্ষীয় জোটের পরিবর্তে কেবল জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখেছেন।
তিনি লিখেন, যার কাছে তার সম্প্রদায় তার মাতৃভূমির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার নিরাপত্তা নেই। আর যার কাছে আরব বা ইসলামি পরিচয় তার মাতৃভূমির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তারও নিরাপত্তা নেই। তার ভাষায়, আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা কেবল মাতৃভূমির জন্যই হওয়া উচিত- এর কোনো অংশীদার থাকা উচিত নয়।
আবদুল্লাহর এই পোস্টের জবাবে ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইসেস্কো) সাবেক প্রধান আবদুলআজিজ আল-তুওয়াইজরি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
তিনি লিখেন, ‘যে ব্যক্তি জায়নবাদীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সহযোগিতা করে, সে কখনো নিরাপত্তা পাবে না।’
অন্য এক পোস্টে আল-তুওয়াইজরি ইউএইর নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ভারতের সঙ্গে আমিরাতের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইসরাইলের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সহযোগিতা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন?
পোস্টের শেষে তিনি একটি আরবি প্রবাদ ব্যবহার করেন- ‘যাদের লজ্জা আছে, তারা মৃত’- যার মাধ্যমে তিনি চুক্তিটির সমালোচকদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন।
চুক্তিকে ঘিরে এই প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার আঞ্চলিক কৌশল ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্যকে নতুন করে সামনে এনেছে।
