ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের নতুন জরিপে আতঙ্ক জলপাইগুড়িতে

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের নতুন জরিপে আতঙ্ক জলপাইগুড়িতে

ফন্ট সাইজ:

ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বেড়া দেয়া হয়নি এমন এলাকায় নতুন করে বিএসএফের জমি জরিপকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার দক্ষিণ বেরুবাড়ির কয়েকটি গ্রামে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বিএসএফের নতুন মাপজোক অনুযায়ী সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করা হলে প্রায় ৮০টি ভারতীয় পরিবারের বাড়ি বেড়ার ওপাশে বাংলাদেশের পাশে পড়ে যেতে পারে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত বছর জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তর যে জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ করেছিল, তাতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। ওই জরিপে সীমান্ত সড়ক ও বেড়া নির্মাণের জন্য জমি চিহ্নিত করার সময় বিদ্যমান বাড়িঘর, সরকারি স্কুল এবং আইসিডিএস কেন্দ্রগুলো বাদ রাখা হয়েছিল। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টেলিগ্রাফ।

দক্ষিণ বেরুবাড়ির ফৌদা পাড়া, ছায়া ঘোরিয়া, বুড়ির জট ও নতুন পাড়া এই চার গ্রামের বাসিন্দারা নতুন জরিপ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, বিএসএফের মাপজোক অনুসরণ করে বেড়া নির্মাণ করা হলে প্রায় ৪০০ মানুষ বা ৮০টি পরিবারের বাড়ি আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও বেড়ার মাঝামাঝি এলাকায় পড়ে যেতে পারে। অনেক পরিবার গত বছরের জেলা প্রশাসনের জরিপের পর নতুন বাড়িও নির্মাণ শুরু করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, প্রশাসনের নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী তাদের বসতবাড়ি ভারতের দিকেই থাকবে।

এর মধ্যে কয়েকটি বাড়ির নির্মাণকাজ অর্ধেকেরও বেশি শেষ হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছেন, দেশের বাইরে বা অন্য রাজ্যে দিনমজুরি করা পরিবারের সদস্যদের পাঠানো অর্থ দিয়ে এসব বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। ফৌদা পাড়ার বাসিন্দা পোলেন্দ্রনাথ রায় বলেন, গত বছর জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তরের জরিপ নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই মাপজোক এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে সীমান্ত সড়ক ও বেড়া নির্মাণ হলেও বসতবাড়িগুলো সুরক্ষিত থাকে। পোলেন্দ্রনাথ রায়ের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেরুবাড়ি-২ বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা নতুন করে জমি মাপছেন। সীমান্ত পিলার থেকে ১৫০ গজ এলাকায় বেড়া এবং আরও ৫০ গজ এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণের হিসাব করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তার অভিযোগ, এই নতুন মাপজোক কার্যকর হলে চার গ্রামের প্রায় ৮০টি বাড়ি বেড়ার ওপারে, অর্থাৎ বাংলাদেশের অংশে পড়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা আতঙ্কিত।

দক্ষিণ বেরুবাড়ি এলাকায় জলপাইগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে ১৪টি গ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ১৯ কিলোমিটার অংশ এখনো বেড়া দেয়া হয়নি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এলাকার বাসিন্দাদের পুরোনো জমির রেকর্ডে এখনকার বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত বোদা এলাকার নাম উল্লেখ রয়েছে। ফলে সীমান্ত সড়ক ও বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের আগে ভূমি দপ্তরকে মৌজা পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং রেকর্ডে জমিগুলোকে ভারতের বেরুবাড়ি মৌজার অধীনে দেখাতে হবে। এরপর জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার কথা।

গত বছর জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তর প্রস্তাবিত সীমান্ত সড়ক ও বেড়ার অবস্থান নির্ধারণ করে অস্থায়ী পিলার বসিয়েছিল। গ্রামবাসীদের দাবি, তখন এমনভাবে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে বিদ্যমান বাড়ি ও সরকারি স্থাপনাগুলো বাদ থাকে। বাসিন্দারা সেই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ব্যবহারে অনাপত্তিপত্রও দিয়েছিলেন। গ্রামবাসীর দাবি, যেসব জমি নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না, সেগুলোর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণও দেয়া হয়েছে। তাই নতুন বিএসএফ জরিপ নিয়ে তাদের প্রশ্ন- প্রশাসনের আগের মাপজোক গ্রহণ করার পর কেন আবার ভিন্ন মাপকাঠিতে জমি মাপা হচ্ছে?

রোববার ফৌদা পাড়া স্কুলের মাঠে গ্রামবাসীরা বৈঠক করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তারা জলপাইগুড়ির জেলাশাসকের কাছে বিষয়টি তুলে ধরবেন। দক্ষিণ বেরুবাড়ি ডিফেন্স কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সারদাপ্রসাদ দাস বলেন, জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তর আগেই পিলার বসিয়ে এমনভাবে সীমানা নির্ধারণ করেছিল যাতে তাদের বাড়িগুলো রক্ষা পায়। তাহলে বিএসএফ আলাদাভাবে জমি জরিপ করছে কেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না। কমিটির আরেক নেতা বলেন, প্রশাসন সহযোগিতা করেছিল বলেই গ্রামবাসীরা জমি ব্যবহারের জন্য অনাপত্তি দিয়েছিলেন এবং বিরোধহীন জমির অনেক মালিক ক্ষতিপূরণও পেয়েছেন। নতুন জরিপের কারণে আবার কেন জটিলতা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দক্ষিণ বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য দুপুরু রায় বলেন, জেলা প্রশাসন ও ভূমি দপ্তর আগে যে সীমানা নির্ধারণ করেছিল, তার বাইরে গিয়ে কোনো নতুন জরিপ তারা মেনে নেবেন না। তিনি বলেন, প্রশাসনের আগের জরিপের পর অনেক বাসিন্দা নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন এবং নিরাপদেই বসবাস করছিলেন। এখন তারা নতুন জরিপের প্রতিবাদ জানাতে জেলাশাসকের দ্বারস্থ হবেন। গ্রামবাসী পোলেন্দ্রনাথ রায়ের ভাষায়, আমরা মুক্ত সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য জমি দিতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু নতুন জরিপের কারণে প্রায় ৮০টি পরিবারের ৪ শতাধিক মানুষ এখন দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন। বিএসএফের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন