বিমানে সিটবেল্ট পরতে অস্বীকৃতি জানানো এক শিশুকে ঘিরে কানাডায় একটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ঘটনাটি শিশুদের বিমান ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা বিধি, অভিভাবকের দায়িত্ব এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে এয়ারলাইনগুলোর করণীয় নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ৬ই আগস্ট। কানাডার পোর্টার এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ভিক্টোরিয়া থেকে টরন্টোর উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখনই একটি ছোট শিশু নিজের আসনে দাঁড়িয়ে যায় এবং সিটবেল্ট বাঁধতে অস্বীকৃতি জানায়। এয়ারলাইনটি জানিয়েছে, শিশুটিকে সিটবেল্ট পরানোর জন্য তার সঙ্গে থাকা অভিভাবক ও কেবিন ক্রুরা একাধিকবার চেষ্টা করলেও সফল হননি।
পোর্টার এয়ারলাইনসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনিরাপদ অবস্থায় বিমানটি উড্ডয়ন করতে পারে না। তাই ক্রুরা বিমানটি আবার টার্মিনালে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং শিশু ও তার সঙ্গে থাকা যাত্রীকে বিমান থেকে নামিয়ে দেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, বিমানটি টার্মিনালে ফিরে আসার পর এতটাই দেরি হয়ে যায় যে মধ্যরাতের পর রানওয়ে বন্ধ হওয়ার আগে আর উড্ডয়ন সম্ভব হয়নি। ফলে বিমানের সব যাত্রীকে পরদিনের ফ্লাইটে পুনরায় বুকিং করতে হয়।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- একটি শিশুর আচরণের কারণে কি পুরো ফ্লাইট বাতিল করা যুক্তিসঙ্গত, নাকি শুধু শিশু ও তার অভিভাবককে বিমান থেকে নামিয়ে দিয়ে অন্য যাত্রীদের যাত্রা চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল? শিশুদের বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ লিয়া টুসো বলেন, ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পোর্টারের ক্রুরা শুধু শিশুটিকেই নয়, বিমানের অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তাও রক্ষা করেছেন। তার মতে, সিটবেল্ট ছাড়া শিশু ‘প্রজেক্টাইলের মতো’ হয়ে যেতে পারে। বিমানে হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি হলে বা উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় কোনো শিশু আসন থেকে ছিটকে গিয়ে অন্য যাত্রীদের আঘাত করতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু শিশুর অবাধ্যতা নয়; বিমানের নিরাপত্তা বিধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে বিমানের এক যাত্রী ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। পোর্টার এয়ারলাইনসের যাত্রী আরিয়েহ কোজুচ বলেন, শিশুটিকে তিনি বেয়াড়া বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে করেননি। বরং শিশুটিকে ভীত মনে হচ্ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি বারবার নিজের আসনের নিচে লুকানোর চেষ্টা করছিল। তাকে জোর করে সিটবেল্ট পরানোর চেষ্টা করা হলে সে সিটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ থেকেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, বিমানভ্রমণে ভয় পাওয়া একটি শিশুকে কি শুধুই ‘অবাধ্য’ হিসেবে দেখা উচিত? নাকি শিশুদের আতঙ্ক, উদ্বেগ কিংবা পরিস্থিতি বুঝতে না পারার বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার?
অন্যদিকে অনলাইনে অনেকে এই ঘটনাকে অভিভাবকদের অতিরিক্ত নমনীয়তার উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সকালের অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানের সহ-উপস্থাপক চার্লস হার্ট বলেন, তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে শারীরিক শাসনের পক্ষে। তার বক্তব্য, এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সন্তানের সঙ্গে আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল। তবে এই মতের বিরোধিতাও হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, বিমানে ভয় পাওয়া শিশুকে শাস্তি দেয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। শিশুদের আচরণের কারণে ফ্লাইট থেকে যাত্রী নামিয়ে দেয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০১৮ সালে শিকাগো থেকে আটলান্টাগামী সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে এক বাবা ও তার মেয়েকে নামিয়ে দেয়া হয়। ঘটনাটি একজন যাত্রী ভিডিও করেছিলেন। তার দাবি ছিল, শিশুটি প্রথমে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করলেও পরে শান্ত হয়ে নিজের আসনে পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় চুপচাপ বসেছিল। এরপরও বিমানকর্মীরা বাবাকে জানিয়ে দেন যে তাদের বিমান থেকে নামতে হবে।
সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস তখন জানায়, বিমানে ছোট শিশুকে নিয়ে ভ্রমণকারী এক যাত্রীর সঙ্গে ক্রুদের কথোপকথন একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
এর আগেও ২০১২ সালে একই ধরনের আরেক ঘটনায় একটি পরিবারকে বিমান থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। পরে তারা এনবিসির এক অনুষ্ঠানে গিয়ে অভিযোগ করে, এয়ারলাইন তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করেনি। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন জেটব্লু অবশ্য বলেছিল, ওই যাত্রীরা দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুদের নির্দেশনা মেনে চলছিলেন না। তাই সবার নিরাপত্তার স্বার্থে ক্যাপ্টেন তাদের বিমান থেকে নামিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
