শোকে স্তব্ধ আত্রাই

সৌদিতে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু

শোকে স্তব্ধ আত্রাই

ফন্ট সাইজ:

বড় ছেলে মোহন সৌদিতে যান সাত বছর আগে, আর মেজো ছেলে সুমন যান দুই বছর হলো। এরপর আর ছুটিতে বাড়িতে আসেননি তারা। নিহত দুই সন্তানের ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন বাবা আব্দুল গাফফার। গতকাল সকালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামে মোহন এবং সুমনদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। রোববার
দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানারে মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। ওই অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইও প্রাণ হারান। ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়িই আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে। দুজনের বাড়ি নাটোর জেলার নলডাঙ্গায়। অপরজনের বাড়ি আত্রাই লাগোয়া রাজশাহীর বাগমারায়। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ঘটনায় শোকে স্তব্ধ গোটা আত্রাই উপজেলা। দুই সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় আব্দুল গাফফার। সন্তানদের কথা স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বড় ছেলে মোহন বলতোÑ ‘বাবা কষ্ট করে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করবো। তারপর বিয়ে করে সংসার করবো। আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কি সর্বনাশ হলো বাবা আমার। তিনি দুই সন্তানের লাশ ফেরত আনার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। নিহত মোহন ও সুমনের বোন আদরী বলেন, ভাই মোহন রোববার বেলা ১টার দিকে ফোন দিয়েছিলেন। ফোন ধরতে দেরি করায় রাগ করে বলেন, এত দেরিতে ফোন ধরলি আর হয়তো ভাই কোনোদিন তোকে ফোন দেবো না।

আত্রাইয়েরর গণ্ডগোহালী গ্রামের আরও দুইজন এ ঘটনায় নিহত হয়। একই গ্রামের নিহত রুবেল এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। পাশের পাড়ার কফিল উদ্দিনের মা জানান, ছেলে এবার বাড়ি এসে বিয়ে করার কথা ছিল। কেবল মাত্র সুখের মুখ দেখতেই আবার দুঃখের সাগরে পড়লাম। আমি আমার সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে চাই। নওগাঁ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, আগুনে পুড়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। মরদেহ ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আত্রাই উপজেলার যে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, তারা হলেনÑ পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল, ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে মো. সুমন হোসেন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান শুভ, গণ্ডগোহালী গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মো. মোহন প্রামাণিক ও মো. সুমন প্রামাণিক, একই গ্রামের জান্নারের ছেলে মো. রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক, সাধনগর গ্রামের মো. সাগর হোসেন, উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মো. মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মো. মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মো. মহিদুল ইসলাম। নিহতদের মধ্যে চারজন গণ্ডগোহালী গ্রামের, তিনজন ডুবাই গ্রামের এবং বাকি ছয়জন উপজেলার পারকাসুন্দা, সাধনগর, উদনপৈ, মাদবপুর, মধ্যেবোয়ালিয়া ও খরসতী গ্রামের বাসিন্দা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বাবার নামও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, তাদের মরদেহ ফেরতসহ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক পরিবারে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রয়োজনীয় কাজ চলছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর খবর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের পরিচয় যাচাইসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এদিকে স্বজনদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চুল কাটাতে গিয়ে বেঁচে যান হাবিবুর: সৌদির যে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেখানে ১৭ বাংলাদেশি থাকতেন একসঙ্গে। অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হলেও একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি হলেন হাবিবুর রহমান। তার বরাতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী জানিয়েছেন, দুপুর দেড়টার দিকে চুল কাটানোর জন্য তিনি সেলুনে যান। ফিরে এসে দেখেন, কারখানায় আগুন জ্বলেছে। রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানারে মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার ওই কারখানায় দুপুর ২টার দিকে আগুন লাগে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এ দুর্ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হাবিবুরের কাছ থেকে দূতাবাস জেনেছে, বাংলাদেশি কর্মীদের পরিচালিত কারখানাটিতে মোট ১৭ জন কাজ করতেন।

লাশ শনাক্ত করতে ডিএনএ টেস্ট লাগতে পারে: সেই কারখানায় কর্মরত ১৬ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এর মধ্যে ৮ জনই মারা গেছেন সরাসরি আগুনে পুড়ে। তাদের লাশ শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী বলছেন, অগ্নিকান্ডে তাদের সবার পাসপোর্ট আর ইকামা পুড়ে গেছে। তাদের পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশের জেলা প্রশাসন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। সৌদির সংশ্লিষ্ট থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্তে আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হবে। তাতে না হলে ডিএনএ পরীক্ষা করা লাগতে পারে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করবে। তারপর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন