সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ চায় ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাৎ

সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ চায় ঢাকা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে এমন পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।

গতকাল সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সকাল ১১টায় এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব নেয়ার ৫৯ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এটাই দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সাক্ষাৎ। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। ওই দুই সাক্ষাতের পর ত্রিবেদী গতকালই ঢাকা থেকে দিল্লি যান।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে বাংলাদেশে স্বাগত জানান। দীনেশ ত্রিবেদীও ঢাকায় দায়িত্ব পালনের গত দুই মাসের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টি বৈঠকে এসেছে। এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য ভারতের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের ইতিবাচক সাড়া আশা করছে।
একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে। ড. খলিলুর রহমান বলেন, তাদের ফেরত পাঠাতে ভারত যেসব কাগজপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ সেগুলো ইতিমধ্যে দিয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ‘সেনসিটিভ’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বিশেষ করে গত ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে বক্তব্যের সুযোগ দেয়ায় বাংলাদেশ প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। এর আগে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতকে সতর্ক করা হয়েছিল, দেশটির মাটি ব্যবহার করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড যাতে না হয়, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

৫ই আগস্টের ওই ঘটনা নিয়েও ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে এবং ভারতের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে।
খলিলুর রহমান বলেন, একটি রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভÑ নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের একটি উপযুক্ত আদালত শেখ হাসিনার বিচার করে তাকে দণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আদালতেই থাকা উচিত। কিন্তু ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি অবমাননাকর আচরণ হিসেবে দেখছে ঢাকা। তার ভাষায়, ওইদিন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের প্রতি ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন’ করেছেন এবং ভারত সরকার সেই কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো স্তম্ভকে ‘আন্ডারমাইন’ করার মতো কোনো ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, সে প্রত্যাশার কথাও ভারতকে জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন যে, বিষয়টি তারা বুঝতে পেরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেও তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থান করে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ার ঘটনায় ভারত অবশ্য বলেছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা যা বলেছেন, তার সঙ্গেও ভারত সরকারের কোনো সমর্থন নেই বলে দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে গত বছরের ডিসেম্বরে গুলিতে শহীদ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর তার হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গে আটক করা হয়। তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আসছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানান তিনি। ত্রিবেদী বলেন, এমন কোনো ইস্যু নেই, যা দুই পক্ষ বসে সমাধান করতে পারে না। তার মনে হচ্ছে, আগামী দিন ভালোই হবে।

দুই দেশের মধ্যে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের নেতারা একসঙ্গে বসলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। গণতন্ত্রে ইস্যু থাকবে, ইস্যু না থাকলে সেটি গণতন্ত্র নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের নিজস্ব ইস্যু থাকবে। কিন্তু দুই দেশের মানুষের ইস্যু একটাইÑ ভালো সম্পর্ক। সম্পর্ক ভালো হলে দুই পক্ষই লাভবান হবে। দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে ত্রিবেদী বলেন, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই বিদ্যমান ইস্যুগুলো সমাধান করতেই হবে। তিনি বলেন, বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার ব্যাপারে তিনি ‘খুবই আত্মবিশ্বাসী’।
গতকালের বৈঠকে সীমান্ত হত্যা ও ভারত থেকে পুশইন নিয়েও সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোববার ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে তার বৈঠকেই এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া আমন্ত্রণ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠিতে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে। পাশাপাশি বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আরেকটি আমন্ত্রণ রয়েছে বলে জানান তিনি। ড. খলিল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো আর বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো এক বিষয় নয়। গঙ্গা চুক্তি ও নদী-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি বলেও জানান খলিলুর রহমান। তার ভাষায়, এটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং এ ধরনের বিষয় আলোচনার জন্য যথাযথ পর্যায় রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন