চলতি বছরের এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ৯টি সাধারণ বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি, দাখিল, এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। এ বছর পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। পাসের হারের দিক থেকে এটি গত ১৯ বছরের সর্বনিম্ন ফল। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৮.৩৬ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.২ শতাংশ। এ বছর পাসের হার কমার অন্যতম কারণ ইংরেজি ও গণিতে ফেল।
সোমবার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসএসসি-সমমান পরীক্ষা ২০২৬ এর ফলাফল প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, বরাবরের মতোই এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। ছাত্রী পাস করেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন, পাসের হার ৬৬.৬৮ শতাংশ এবং ছাত্র পাস করেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। পাসের হার ৫৭.৮৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন। এদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১.৬৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন; রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৬৩.৬৭ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন; কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৬৫.৪২ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৮১৪ জন; যশোর বোর্ডে পাসের হার ৬৬.২৭ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন; চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯.৪৮ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন; বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০.৩৫ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৭৭৮ জন; সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫৮.৩৩ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন; দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৫৮.০৫ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৬৩৯ জন এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৭.৩৯ শতাংশ; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন, পাসের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন। পাশের হার ৫৮.২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন। ১১টি বোর্ডের ফলাফলে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। সব থেকে ফল খারাপ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের হিসাবে সবার নিচে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।
২০০১ সাল থেকে এসএসসিতে জিপিএ চালু হয়। ওই বছর পাসের হার ছিল ৩৫.২২ শতাংশ। পরের বছর ৪০.৬৩ শতাংশ। একইভাবে পরের বছরগুলোতে পাসের হার ছিল যাথাক্রমে ৩৫.১১, ৪৮, ৫২.৬৭, ৫১.৪৭ শতাংশ। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭.০৭ শতাংশ। এরপর থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফল শুধু ঊর্ধ্বমুখীই হতে থাকে। আওয়ামী সরকারের জমানায় ৮০ শতাংশের বেশি পাস ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত ফলে পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ।
চলতি বছরের পাসের হার কমার অন্যতম কারণ মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়। সেইসঙ্গে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেলকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ দু’টি বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্বল হওয়ায় তাদের মধ্যে ফেল করার হার বেড়েছে। এ বিভাগে পরীক্ষার্থী ছিল ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন। পাস করেছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন, পাসের হার ৪৮.৭৪ শতাংশ। বিষয়ভিত্তিক ফলেও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৬.৬৪ শতাংশ এবং গণিতে ৬৯.৬১ শতাংশ; বরিশালে ইংরেজিতে ৬৯.২৪ শতাংশ ও সিলেটে ৬৯.১১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গণিতেও ময়মনসিংহ ও মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৬৯ শতাংশ। উল্টো দিকে আইসিটি বিষয়ে পাসের হার অনেক ভালো। অধিকাংশ বোর্ডে আইসিটিতে ৯৮-৯৯ শতাংশের কাছাকাছি পাস করেছে।
৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এরমধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৫৭, মাদ্রাসায় ২২৬ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। এবার শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৭৮টি। আশানুরূপ ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা ফল পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ পাবে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পত্রের ফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য তাদের ১৫০ টাকা করে ফি গুণতে হবে। এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পরীক্ষার্থীদের https://rescrutiny.eduboardresults.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে নির্ধারিত স্থানে রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর পূরণ করে আবেদন করা যাবে।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মতে ফল খারাপ নয় বরং সুন্দর হয়েছে। এবার শিক্ষার্থীদের নম্বর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। যদি কোনো শিক্ষার্থীকে ভুল নম্বর দেয়া হয়ে থাকে বা প্রাপ্য নম্বর না দেয়া হয় তবে সেইসব উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ন করা হবে। রিভিউ কমিটি সেই খাতা পুনঃমূল্যায়ন করবে। প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর যে নম্বর প্রাপ্য, তাই তাকে দেয়া হবে। আগে পদ্ধতি ছিল যদি কোনো শিক্ষার্থী রি-এক্সামিন করতো, তাহলে শুধু টেব্যুলেশন শিটটা দেখা হতো, সত্যিকার অর্থে ওই শিক্ষার্থীর খাতা পাল্টিয়ে গিয়েছে কিনা এবং শিক্ষক যথাযথ নম্বর দিয়েছেন কিনা, সেটা পুনঃমূল্যায়ন করার ব্যবস্থা ছিল না। এবার আইনগতভাবে প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর জন্য উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন বলেন, যারা ভালো ফলাফল করেছে, তাদের পাশাপাশি তাদের পরিবারও গর্বিত। তবে কোনো কারণে যারা কাক্সিক্ষত বা প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এটাই জীবনের শেষ সুযোগ নয়। যারা কাক্সিক্ষত ফলাফল পায়নি, সরকার সবসময় তাদের পাশে থাকবে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, ভবিষ্যতেও যেন তারা সব বাধা পেরিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারে।
কেন এই ফল বিপর্যয় জানতে চাইলে রংপুর জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের একজন ইংরেজি শিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, প্রধান কারণ শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী নয়। আর ইংরেজি মাতৃভাষা না হওয়ার কারণে তারা ভয় পায়। আর এই শিক্ষার্থীরা করোনার কারণে সবথেকে বেশি ক্ষতিগস্ত হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ে বাংলায় লিখতে হয় তাদের জন্য সহজ হয়।
গণিতের শিক্ষক আফজাল হোসেনও একই সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, নৈর্ব্যক্তিক না থাকার কারণে লিখে ৩৩ নম্বর শিক্ষার্থীদের তুলতে কষ্টসাধ্য হচ্ছে। এজন্য প্রধানত গণিতের শিক্ষকদের জন্য একটা প্রশিক্ষণ জরুরি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল কেন তা খতিয়ে দেখা হবে। কীভাবে শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে মানবিকের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেয়া যায়, তা নিয়েও আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
