যে কারণে বাড়ছে লোডশেডিং

যে কারণে বাড়ছে লোডশেডিং

ফন্ট সাইজ:

দেশে গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। সারা দেশে শহরের চেয়ে
গ্রামে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। ময়মনসিংহ এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ থাকে না বলে গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন। কোথাও ১০ ঘণ্টার উপরে বিদ্যুৎ থাকে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট ও কয়লা কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক বিঘ্ন হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যদিও গতকাল সন্ধ্যায় আদানি ১০১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে বলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। কোম্পানিটির কাছ থেকে ১৪৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে প্রায় দিনই। যদিও ১৬০০ মেগাওয়াট দেয়ার কথা। বাকিটা সিস্টেম লসের কারণে হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়াও সঞ্চালন লাইনের সমস্যা এবং বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিগুলোর অন্তর্কোন্দলের কারণে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের অনেকের পরামর্শ কোনো একটি বিভাগে একটি মাত্র বিতরণ কোম্পানি থাকলে লোডশেডিং ৫০ শতাংশ কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, গ্যাস সরবরাহের সংকট দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। তীব্র গরমে সারা দেশের লোডশেডিং সব রেকর্ড ভঙ্গ করছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, কয়লা এবং গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। তাই লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু গত দুইদিন বিকাল ৩টায় পর লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াটের উপরে চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণ কী জানতে চাইলে গতকাল রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে পিডিবি’র সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, গ্যাস সংকট ও কয়লার কারণে বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ছে। তেল দিয়ে উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলো বেশি সময় উৎপাদনে রাখা যাচ্ছে না। এজন্য তেল দিয়ে ধাপে ধাপে উৎপাদন করা হচ্ছে। সঙ্গে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদনও কম আসছে দুইদিন ধরে। কেন কম আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদানি জানিয়েছে তাদের কয়লা পরিবহনে একটু সমস্যা হয়েছে। আজ পুরোদমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ কর্মকর্তা। তিনি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় সাড়ে ৭টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা তো বেশি। তাতে ঘাটতি আছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবি’র হিসাব অনুযায়ী রোববার বিকাল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকাল ৫টায় এই সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে ঠেকেছে। এর পরও লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।
পিডিবি জানিয়েছে, আদানির সরবরাহ হঠাৎ করে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণ পিক আওয়ারে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট দেয়া হলেও গত রোববার বিকাল ৫টায় দেয়া হয় ৮১৫ মেগাওয়াট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আদানি কয়লা পরিবহন করতে পারছে না। এ কারণে কয়লার মজুতও কমে গেছে। তাই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে পিডিবিকে জানিয়েছে। তবে তাদের এ তথ্য কতোটুকু সত্য তা যাচাই করতে পারেনি পিডিবি। আদানি ছাড়া কয়লা সংকট এবং যান্ত্রিক কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে কমপক্ষে দুই হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশের সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। অথচ সক্ষমতা আছে ১০ হাজার মেগাওয়াটের। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো। অথচ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
পিডিবি জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে কমপক্ষে দুই হাজার এবং কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমেছে স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে এক হাজার মেগাওয়াট। মূলত এ তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতির কারণে সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের অন্ধকার ঢেকে গেছে।

এদিকে, ২১শে জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ধরে গেলে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এ কারণে সারা দেশে গ্যাস সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুতের উৎপাদন অনেক কমে যায়। সে টার্মিনাল মেরামতের পর ৫ই আগস্ট রাতে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সব কিছু ঠিক থাকলে সোমবার রাত বা মঙ্গলবার থেকে এক্সিলারেট এনার্জি পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন