জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে চলছে সংসদীয় আসনের হিসাব-নিকাশ। দল থেকে বহিষ্কারের পরও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে থাকবেন কিনাÑ এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে নৈতিক স্খলনের দায়ে তাকে বহিষ্কার করে জামায়াত। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে বহিষ্কার ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় জামায়াত। এরপরও এ নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা। এখনো ঝুলে আছে গাজী নজরুলের ভাগ্য। দলীয়ভাবে গাজী নজরুল জামায়াতের বাইরে চলে গেলেও সংসদীয়ভাবে তিনি এখনো সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি। এদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে এই সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন বলেও জানা গেছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র বলছে, জামায়াত এমপি গাজী নজরুলের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিকতা চলমান রয়েছে। কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য যতক্ষণ সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকবেন, ততক্ষণ তিনি ভোট দিতে পারবেন।
ইসি জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। এতে তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার সংসদ সদস্যদেরই রয়েছে। ফলে ইসি’র এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট বর্তমান মুহূর্তে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদকে বাতিল বা শূন্য হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। কিন্তু কোনো সংসদ সদস্যকে তার দল বহিষ্কার করলে তার আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবেÑএমন স্পষ্ট বিধান নেই।
এ কারণেই গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যার প্রশ্নটি সামনে এসেছে বারবার। তিনি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেননি; বরং দলই তাকে বহিষ্কার করেছে। ফলে শুধু বহিষ্কারের কারণেই তার সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে কিনা, তা নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। কিন্তু গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে এমন কোনো আদালতের দণ্ডের তথ্য নেই। ফলে দলীয় বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের প্রশ্নটি সরাসরি ৬৬ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে অতীতেও দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যের পদ বহাল থাকার নজির রয়েছে। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ তৎকালীন স্পিকার বহাল রেখেছিলেন। এ ছাড়াও ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে গোলাম রেজা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে ২০১২ সালে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি সংসদে স্বতন্ত্র (স্বাধীন) এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ইসি’র পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার ভোট দেয়ার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা হলেও সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। একদিকে জামায়াতের বহিষ্কারাদেশ, অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা এবং ইসি’র অবস্থান। সব ব্যাখ্যার ফলাফল ও সাংবিধানিক জটিলতায় গাজী নজরুলের সংসদীয় ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আবদুর রহমানেল মাছউদ মানবজমিনকে বলেন, কোনো বৈঠক হয়নি। সংসদ (স্পিকার) থেকে যদি নির্বাচন কমিশনের কাছে এ বিষয়ে কোনো কিছু আসে। তখন ইসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এর আগে ইসি’র পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পর্যায় থেকে বিষয়টি আমাদের কাছে জানানো হয়নি। আমার কাছে কিছু আসেওনি। আমি যতদূর জানি, এ বিষয়ে কিছু আসেনি। এ মুহূর্তে এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
ইসি কমিশনার বলেন, সংসদ থেকে এ বিষয়ে কোনো কিছু এলে ইসি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এরপর আইনগতভাবে যে পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন, সেটিই করা হবে।
