জিয়াউল আহসানের নির্দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে ৩ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ

জিয়াউল আহসানের নির্দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে ৩ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ

ফন্ট সাইজ:

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ২০১১ সালের ১১ই জুলাই রাতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করেছেন সাবেক লে. কর্নেল মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি ওই সময় র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও হত্যার ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। মামলায় রফিকুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের ৭ নম্বর সাক্ষী।

সাক্ষ্যে রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১১ সালের ১১ই জুলাই র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক থাকা অবস্থায় তৎকালীন ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে রাতে একটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে’ যাওয়ার জন্য অফিসারদের প্রস্তুত রাখতে বলেন। অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউল আহসান তাকে বলেন, ‘তোমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নেই। সময়মতো আমার আদেশ অনুযায়ী কাজ করবে।’ পরে রফিকুল ইসলাম তার তিন কর্মকর্তা—মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল ও মেজর এমারতকে নিয়ে র‌্যাব সদরদপ্তরে যান। সেখান থেকে জিয়াউল আহসানসহ চারটি গাড়ি নিয়ে তারা রওনা হন।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, প্রায় ৪০ মিনিট চলার পর একটি সেতুর ওপর গাড়িগুলো থামানো হয়। সেখানে একটি গাড়ি থেকে হাত ও মুখ বাঁধা এক ব্যক্তিকে নামিয়ে সেতুর রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করানো হয়। এরপর জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তির মাথায় গুলি করে তাকে সেতুর ওপর থেকে পানিতে ফেলে দেন বলে দাবি করেন রফিকুল ইসলাম। এর কয়েক মিনিট পর আরেকটি সেতুতে গাড়ি থামানো হয়। সেখানে একইভাবে হাত ও চোখ বাঁধা এক ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামানো হলে জিয়াউল আহসান মেজর সাজ্জাদুলকে তাকে ‘মেরে ফেলার’ নির্দেশ দেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন রফিকুল ইসলাম। তবে সাজ্জাদুল এতে অপারগতা প্রকাশ করলে জিয়াউল আহসান তাকে গালমন্দ করে গাড়িতে গিয়ে বসতে বলেন। এরপর রফিকুল ইসলাম গাড়িতে ফেরার সময় একটি গুলির শব্দ শুনতে পান বলে জানান।

আরও কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তার পাশে আবার গাড়ি থামানো হয়। তখন হাত ও চোখ বাঁধা একজন ব্যক্তিকে দুই ব্যক্তি রাস্তা পার করে নিয়ে যেতে দেখেন বলে সাক্ষ্যে জানান রফিকুল ইসলাম। কয়েক মিনিট পর সেখান থেকেও গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। সাক্ষ্য অনুযায়ী, পরে গাড়িতে ফিরে মেজর তরিকুল রফিকুল ইসলামকে জানান, জিয়াউল আহসান তাকেও একজনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তি ওই ব্যক্তিকে হত্যা করেন বলে তরিকুল তাকে জানান।

রফিকুল ইসলাম বলেন, পরদিন অফিসে গিয়ে মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ পান। কয়েক দিন পর সংবাদপত্রে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই-তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পারেন। তবে জিয়াউল আহসানের পক্ষে জেরায় রফিকুল ইসলাম তার জবানবন্দির বিভিন্ন অংশ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে নিয়ে কখনো কোনো ঘটনাস্থলে যাননি। ঘটনার রাতে কেন তাদের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তিনি জানতেন না।

তার দাবি, ঘটনাস্থলগুলো সম্পর্কে তিনি পরে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারেন। জেরার একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাইরে কোনো অভিযান পরিচালনা করতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। প্রতিটি মুভমেন্টের ডায়েরি সংরক্ষণ করতে হতো বলেও জানান তিনি। তবে ১১ জুলাইয়ের ওই রাতের অভিযানের বিষয়ে কোনো ডায়েরি সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা তার মনে নেই। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী আরও বলেন, ওই রাতে তিনি ও তার দুই কর্মকর্তা সশস্ত্র ছিলেন।

তবে ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার বা র‌্যাব-৩-এর অন্য কর্মকর্তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেন। মামলার পরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৬ই আগস্ট দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন