জুলাই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে ৪টি অডিও ফোনালাপ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ কয়েকজন নেতার ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়। এগুলোর মধ্যে প্রায় ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপটি ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের মধ্যে হয়েছিল।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ অডিওটি উপস্থাপন করে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ শুনানি হয়। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত ৪ঠা আগস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য ৬ আসামি হলেনÑ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তাদের সবাই পলাতক রয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ফোনালাপটি ২০২৪ সালের ২০শে জুলাই দুপুর ২টার দিকে হয়। ওই সময় জুলাই আন্দোলনের মধ্যে টেলিভিশন সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাদের ও আরাফাতের মধ্যে কথা হয়। ফোনালাপের শুরুতে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, যারা নির্দেশ মানছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জবাবে আরাফাত দাবি করেন, এরই মধ্যে দু-একটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদেরও সতর্ক করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত অডিও অনুযায়ী, সংঘাত বা মারামারির ভিডিও সম্প্রচার করলে সংশ্লিষ্ট টেলিভিশনকে ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ ঘোষণা করে আজীবনের জন্য বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন আরাফাত। তিনি আরও বলেন, টেলিভিশনগুলোতে সংঘাতের ছবি প্রচার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের বিষয়েও কথা বলেন দুজন। আরাফাত দাবি করেন, কোটা আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক পক্ষ কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, যাদের সঙ্গে সরকার আলোচনা করছে; অন্য পক্ষকে তিনি ‘জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, আরাফাত বলেন, কারফিউর সিদ্ধান্ত ওই দ্বিতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ওবায়দুল কাদের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বলে প্রসিকিউশনের দাবি। কথোপকথনের শেষদিকে আরাফাত জানান, আলোচনার পর তিনি গণভবনে গেছেন এবং একটি ব্রিফিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ওবায়দুল কাদের নিজের বাড়িতে ফেরার কথা জানিয়ে আহত দলীয় নেতাকর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলেন। আরাফাত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
কর্মীদের জন্য টাকা সংগ্রহের কথোপকথনের দাবি: এ মামলায় এর আগে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আরেকটি ফোনালাপও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য কাদেরকে উসকানি দিতে শোনা যায়।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বরাদ্দ নিয়ে ওবায়দুল কাদের ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মির্জা আজমের কথোপকথনের আরও দুটি অডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, একটি ফোনালাপ হয় ২০২৪ সালের ২১শে জুলাই রাত ৮টা ৫১ মিনিটে। প্রায় ২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে কারফিউ চলাকালে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি, জ্বালানি ও অর্থের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন তারা।
মির্জা আজম কারফিউর মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য প্রস্তুতি রাখার কথা বলেন। জবাবে ওবায়দুল কাদের তাদের কাছে থাকা ‘ফুয়েল-টুয়েল’ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার কথা জানান। একপর্যায়ে মির্জা আজম বলেন, ওয়ার্ড পর্যায়ে লোকজন রাখতে হলে অর্থ দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সংসদ সদস্য এলাকায় অর্থ খরচ করছেন না। নানক ও নিখিল এলাকায় অর্থ ব্যয় করছেন বলেও কথোপকথনে উল্লেখ করেন তিনি। ধানমন্ডির ফেরদৌস ও আরাফাতের প্রসঙ্গও আসে। ওবায়দুল কাদের তখন আরাফাতের এলাকার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা হানিফকে দেয়ার কথা জানান। প্রয়োজন হলে হানিফকে অর্থ খরচ করতে বলা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্য ফোনালাপটি হয় ২০২৪ সালের ৩রা আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিটে। প্রায় ১ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অর্থ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদের মির্জা আজমকে পরদিন ‘একটু বেশি’ অর্থ দেয়ার কথা বলেন। তিনি সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের ব্যবস্থা করার কথাও জানান। কথোপকথনে বিভিন্ন সংগঠনের জন্য অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়। ট্রান্সক্রিপ্টে মহিলা আওয়ামী লীগের জন্য তিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের জন্য সাত, যুবলীগের জন্য সাত, কৃষক লীগের জন্য তিন এবং ছাত্রলীগের জন্য পাঁচ- এভাবে অর্থ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মোট ৫২-এর কথাও বলা হয়।
মির্জা আজম জানান, বরাদ্দের ‘ব্রেকআপ’ বিপ্লবের কাছে থাকার কথা। সেই অনুযায়ী অর্থ দেয়ার অনুরোধ করেন তিনি। জবাবে ওবায়দুল কাদের পরদিন সকাল ১০টার পর টাকা দেওয়ার কথা জানান। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আসার কথাও বলেন মির্জা আজম। কথোপকথনের শেষদিকে মির্জা আজম আরও অর্থ সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পরিমাণ ‘ডাবল’ হলে আরও ভালো হতো। ওবায়দুল কাদেরও আরও অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হলে তা দেওয়ার কথা জানান বলে ট্রান্সক্রিপ্টে উল্লেখ রয়েছে। তবে অডিও দুটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফোনালাপের কণ্ঠস্বরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রকাশিত ট্রান্সক্রিপ্টে কথোপকথনে থাকা ব্যক্তিদের মির্জা আজম ও ওবায়দুল কাদের হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
