এনাম মেডিকেলের মেঝেতে ভেসে যাওয়া রক্তের স্রোতে এক পিতার নিঃশব্দ হাহাকার

এনাম মেডিকেলের মেঝেতে ভেসে যাওয়া রক্তের স্রোতে এক পিতার নিঃশব্দ হাহাকার

ফন্ট সাইজ:

সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের তিন তলার ইমার্জেন্সি রুম। একটি ট্রলিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে ১৬ বছর ৭ মাসের এক কিশোর আব্দুল আহাদ সৈকতকে। তার ঠিক নিচে মেঝের ওপর রাখা দু’টি প্লাস্টিকের বালতি কানায় কানায় ভরে উঠেছে রক্তে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সাভারের রক্তক্ষয়ী সেই বিকালে এ দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন পিতা মো. নজরুল ইসলাম। সেদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শাহাদাত বরণ করেন সাভারের ঢাকা কমার্স কলেজের একাদশ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী বীর শহীদ আব্দুল আহাদ সৈকত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার এই অদম্য তরুণের আত্মত্যাগ আজ পরিণত হয়েছে রক্তস্নাত নতুন বাংলাদেশের এক অবিনাশী উপাখ্যানে। শহীদ সৈকতের স্থায়ী নিবাস বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার উত্তর দিঘলকান্দি গ্রামে। পিতা মো. নজরুল ইসলাম ও মাতা মোসাম্মৎ আম্বিয়া বেগম সুইটির দুই সন্তানের মধ্যে সৈকত ছিলেন বংশের একমাত্র ছেলে সন্তান। ছোট বোন নাজমুন নাহার নূরী শিবগঞ্জ সরকারি কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ছেন।

শৈশব থেকেই সৈকতের ভেতরে এক অসাধারণ মেধা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বগুড়ার বালুয়াহাট অক্সফোর্ড স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পরিবার নিয়ে তারা সাভারে স্থানান্তরিত হন। সাভার শাহীন স্কুল থেকে এসএসসিতে ১২৯৫ নম্বর পেয়ে বিরল সাফল্য অর্জন করেছিলেন সৈকত। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঢাকা কমার্স কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। সৈকতের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল একজন দক্ষ চিকিৎসক হওয়া। নবম শ্রেণিতে থাকতেই বাবার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে গেলে কী করতে হয়। বাবার পরামর্শ শুনে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই নিজ উদ্যোগে অনলাইন থেকে ৫-৬টি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার বই কিনে পুরো পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন ছিল না; গ্রামে নিজেদের বসতবাড়ির পাশে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল, যেখানে ভবিষ্যতে প্র্যাকটিস শুরু করে এলাকার অভাবী মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সৈকত।

কিন্তু ৫ই আগস্টের সেই কালো বিকেল সৈকতের সেই মানবিক স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়। সেদিন দুপুরের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে পিতা জানান, দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে গোসল ও জোহরের নামাজ শেষ করে সৈকত পরিবারের সবার সঙ্গে খাবার খায়। এরপর নিজের ঘরের টেবিলে বসে কলেজের প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখছিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে সে আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে যায়।
নামাজ শেষে সাভার নিউ মার্কেটের সামনে দাঁড়ালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বিজয় মিছিল সেখানে পৌঁছে। এর আগের দিনই জাহাঙ্গীরনগরে আন্দোলনরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ এক বড় ভাইকে নিজের এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন সৈকত। মিছিলে থাকা সেই পরিচিত বড় ভাইয়েরা সৈকতকে দেখতে পেয়ে আনন্দে জড়িয়ে ধরেন এবং স্বৈরাচারের পতনের উৎসবে শামিল করে বিজয়ের মিছিলে সঙ্গে নিয়ে যান।

পিতা নজরুল ইসলাম জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। ফোনে সৈকত জানিয়েছিল, সে সেই রক্ত দেওয়া বড় ভাইদের সঙ্গেই আছে এবং তিনি সুস্থ আছেন। পিতাকে আশ্বস্ত করে দ্রুত বাড়ি ফেরার কথাও বলেছিল। কিন্তু ঠিক ১৫ মিনিট পরেই আসে সেই মর্মান্তিক ফোন কল। সৈকতের বন্ধু নাঈম ফোন দিয়ে জানান, এনাম মেডিকেলের সামনে গুলিবর্ষণ হয়েছে এবং সৈকতের শরীরে গুলি লেগেছে।

আসলে সেদিন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এনাম মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন সাভার মডেল থানা ও শাহীবাগ এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা পুলিশের সহায়তায় আশপাশের বহুতল ভবন থেকে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করেছিল। সেই বহুতল ভবন থেকে ছোড়া একটি বুলেট সৈকতের মাথা ও বুকে বিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশ সরকারের গেজেটে ৪৯০ নম্বরে বীর শহীদ হিসেবে স্থান পেয়েছেন আব্দুল আহাদ সৈকত। তৎকালীন অন্তর্বতী সরকারের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকার চেক এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া ২ লাখ টাকার অনুদান সহায়তা পৌঁছানো হয়েছে পরিবারের কাছে। তবে এসব বস্তুগত সহায়তার উর্ধ্বে পিতা নজরুল ইসলামের একটাই আকুতি দেশবাসীর কাছে, সবাই যেন তার নিষ্পাপ, মেধা ও মানবিক গুণাবলীতে উজ্জ্বল শহীদ সৈকতের জন্য পরম করুণাময়ের দরবারে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মর্যাদার প্রার্থনা জানান। আর চান বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন