অবৈধ দখলদারদের থাবায় ধ্বংসের মুখে পাবনার পাখির অভয়াশ্রম

অবৈধ দখলদারদের থাবায় ধ্বংসের মুখে পাবনার পাখির অভয়াশ্রম

ফন্ট সাইজ:

পাবনার বেড়া উপজেলায় ছয় বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক পাখির অভয়াশ্রম বর্তমানে অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে দান ও ক্রয়সূত্রে মালিকানা দাবি করে একাধিক ব্যক্তি অভয়াশ্রমের গাছপালা কেটে ফেলছেন, নির্মাণ করছেন স্থাপনা, ফলে আবাস হারাচ্ছে শত শত পাখি। বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা। অভয়াশ্রম রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলে জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের হরিরামপুর মৌজায় প্রয়াত আকাশ কলি দাস প্রায় ছয় দশক আগে নিজের বসতবাড়ির প্রায় ছয় বিঘা জমিতে গড়ে তোলেন এই পাখির অভয়াশ্রম। নিঃসন্তান ও অবিবাহিত আকাশ কলি দাস পাখিদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। প্রকৃতির প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসার কারণে তিনি স্থানীয়ভাবে ‘পাখিবন্ধু’ নামে পরিচিতি পান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হন। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই বাড়িতে তিনি নিজ হাতে লাগান নানা প্রজাতির বড় বড় গাছ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলঘেরা বাড়িটি পরিণত হয় পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে। দেশি পাখির পাশাপাশি শীত মৌসুমে এখানে আশ্রয় নিতো পরিযায়ী পাখিরাও। দেশিবক, কানি বক, পানকৌড়ি, শামুকখোল, ঘুঘু, দোয়েল, শালিক, ছোট ও বড় সরালি, খঞ্জনা, পাতিহাঁস-বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কোলাহলে মুখর থাকতো পুরো এলাকা। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মৎস্য অধিদপ্তরের ওয়েটল্যান্ড বায়োডাইভারসিটি রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট (ডব্লিউবিআরপি) আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশ কলি দাসের বাড়িটিকে ‘পাখির অভয়াশ্রম’ হিসেবে ঘোষণা করে। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ২০২৪ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সরকারের ‘অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজার্ভেশন-২০২৪ সহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। তবে জীবদ্দশাতেই নিজের মৃত্যুর পর অভয়াশ্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন আকাশ কলি দাস। সেই আশঙ্কাই যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে তার মৃত্যুর ছয় মাস না পেরোতেই। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগে তিনি গত বছরের ১৮ই আগস্ট মারা যান। এর পরপরই দানপত্র ও বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে তিনজন নতুন মালিকের আবির্ভাব ঘটে অভয়াশ্রমে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে আকাশ কলি দাসের মায়ের খালাতো ভাইয়ের ছেলে পরিচয়ে অসিত ঘোষ নামের এক ব্যক্তি তাকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। ওই সময় স্মৃতিভ্রমে ভুগছিলেন আকাশ কলি দাস এবং কাউকে চিনতে পারতেন না। তার দীর্ঘদিনের কর্মচারীদেরও সরিয়ে দেয়া হয়। পরে অসিত ঘোষ দাবি করেন, মৃত্যুর আগে আকাশ কলি দাস সজ্ঞানে তার কাছে সম্পত্তি দান ও বিক্রি করে গেছেন। অথচ ওই রেজিস্ট্রির সময় কোনো জনপ্রতিনিধি, প্রতিবেশী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন না; নেই কোনো ছবি বা ভিডিও প্রমাণ। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে প্রভাবিত করে জাল দলিলের মাধ্যমে অভয়াশ্রমের জমি আত্মসাৎ করা হয়েছে। আকাশ কলি দাসের প্রতিবেশী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রুবেল মিয়া বলেন, যে মানুষটি জীবনে কখনো হাঁস-মুরগিও বিক্রি করেননি, তিনি কীভাবে তার সারাজীবনের স্বপ্ন পাখির অভয়াশ্রম বিক্রি করবেন-এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, হরিরামপুর মৌজায় আকাশ কলি দাসের নামে প্রায় ৪০ বিঘা জমি ছিল। এর মধ্যে চলতি বছরে আট বিঘার কিছু বেশি জমির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। বাকি জমি এখনো তার নামেই রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বাকি সম্পত্তিও জাল কাগজে আত্মসাতের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মীরা দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। লিখিত অভিযোগদাতা ইলিয়াস হোসাইন বলেন, “আকাশ কলি দাস শুধু একজন মানুষ নন, তিনি ছিলেন প্রকৃতির একনিষ্ঠ রক্ষক। তার গড়ে তোলা অভয়াশ্রম আমাদের এলাকাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছিল। এটি ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে পাঠ্যক্রমেও আকাশ কলি দাসের অভয়াশ্রমকে একটি মডেল হিসেবে পড়ানো হয়। একজন প্রকৃতিপ্রেমীর আজীবনের স্বপ্ন এভাবে নষ্ট হওয়া মেনে নেয়া যায় না। জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা জানান, অভয়াশ্রমটি রক্ষায় জেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং পাখিদের আবাসভূমি রক্ষায় প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন