ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট সরবরাহের মাফিয়া আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল। তার বিরুদ্ধে ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট সরবরাহ, জালিয়াতি এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ায় তিনি এখনো একই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশগামী ব্যক্তিদের বাইরের দেশে এক বছর গাড়ি চালাতে হলে তার আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিটের দরকার হয়। এই পারমিট দিয়ে থাকে অটোমোবাইল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এএবি)। এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলের কাছ থেকে পারমিট নিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো গ্রাহক।
এসব গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে এসোসিয়েশনের পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। পারমিটের নামে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে অটোমোবাইল এসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তাকে বাদ দেয়া হলেও এখনো তিনি প্রতারণা করে যাচ্ছেন ভুয়া পারমিট দিয়ে। ঘরে বসেই ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দিচ্ছেন। এসোসিয়েশনের অনেক বই ও সিল তার কাছে রয়ে গেছে। সেগুলো ব্যবহার করে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। পারমিট দ্রুত করে দেয়ার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা নিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া অটোমোবাইল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নম্বর এখনো তিনি ব্যবহার করছেন। একদল দালাল চক্রের যোগসাজশে এসব পারমিট সরবরাহ করা হয়। মানবজমিনের এই প্রতিবেদককে দেয়া ভুয়া পারমিটের জন্য কোনো আবেদন, লোকাল লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি কিংবা পাসপোর্টের ফটোকপিও জমা নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ওই আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিটে ভুল নাম ও ভুল ঠিকানা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পারমিটে দেয়া নিজের স্বাক্ষরও ব্যবহার করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ডি ল অটোমোবাইলের (এফআইএ) একমাত্র সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট ইস্যু করে অটোমোবাইল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এএবি)। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী ফুয়াদ পাশা বাবুলের নেতৃত্বে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট পেতে চালককে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ কর্তৃক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হয়। লাইসেন্সের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট নিতে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে তা পূরণ করতে হয় এবং বিআরটিএ’র ড্রাইভিং লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি জমা দিতে হয়। এ ছাড়া প্রয়োজন হয় পাসপোর্টের ফটোকপিও। নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দেয় অটোমোবাইল এসোসিয়েশন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বাবুলের নিজের নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর-১২ এর পল্লবী এলাকার রোড-৮, ব্লক-সি, ৮/৩৯ নম্বর বহুতল ভবনে তার ১১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। শান্তিনগরে একটি পাঁচতলা বাড়ি, মিরপুর ডিওএইচএসে একটি ফ্ল্যাট, মিরপুরের মাটিকাটায় একটি প্লট এবং উত্তরা সেক্টর-১৩ এর নলগোলা এলাকায় কয়েক দাগ জমির মালিকানাও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারে একটি বিলাসবহুল হোটেলে তার অংশীদারিত্ব এবং সাভার, গাজীপুর, ত্রিশাল ও ময়মনসিংহ সহ বিভিন্ন এলাকায় ছেলেমেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি ভারতের পৈতৃক এলাকায়ও তার সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া কলকাতার মহেশতলায় তার ছেলে রাশেদুল হাসানের ৩টি বাড়ি রয়েছে।
অটোমোবাইল এসোসিয়েশনে এক সময় তার একক নেতৃত্ব ছিল। তার ছেলে রাশেদুল হাসান কাউন্টারে বসতেন, তার জামাতা আশরাফুল আলম লিটনও কাজ করতেন ওই প্রতিষ্ঠানে। সিন্ডিকেট করে এসোসিয়েশনকে ব্যবহার করে ভুয়া পারমিট দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। বর্তমানে আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল মিরপুর-১২ এর পল্লবী ৩৯ নাম্বার বাসা, রোড নাম্বার ৮, ব্লক-‘সি’র নিজের সাততলা বাসায় বসে ভুয়া পারমিট দেন। তবে দালাল ছাড়া কেউ তার কাছ থেকে সরাসরি পারমিট নিতে পারে না।
এই প্রতিবেদক ভিন্ন পরিচয়ে বাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ১৩ হাজার টাকার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট করে দেয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি কারও যদি বিআরটিএ’র ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকে সেক্ষেত্রে জাল লাইসেন্স করে দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে পাসপোর্টের ফটোকপি ও রক্তের গ্রুপের তথ্য চাইলেও পরে প্রতিবেদকের দেয়া ভুল নাম-ঠিকানার আবেদনপত্র, বিআরটিএ’র লাইসেন্সের সত্যায়িত কপি কিংবা পাসপোর্টের ফটোকপি ছাড়াই দুইদিনের মধ্যে জাল আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট তৈরি করে দেন।
এ বিষয়ে অটোমোবাইল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা আলী ফুয়াদ পাশা বাবুল মানবজমিনকে বলেন, ২০২৪ সালে আমি এসোসিয়েশন থেকে বের হয়ে এসেছি। আমি এখন আর এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেই। এগুলো আমার নামে মিথ্যা বলা হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এগুলো ভুয়া। সব অভিযোগ মিথ্যা।
প্রতিষ্ঠানটির ডিজিএম অপারেশন মনির হাসান বলেন, বাবুলের বিরুদ্ধে পূর্বে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় অফিস থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অটোমোবাইল এসোসিয়েশন থেকে কোনো আইনি পদক্ষেপ এবং ছাপা ড্রাইভিং লাইসেন্সের বই উদ্ধারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যেহেতু আপনারা অভিযোগ করছেন সে জাল বই দিচ্ছে এবং অফিস থেকে বই নিয়ে গিয়েছে তাহলে আমরা সেগুলো উদ্ধারে চেষ্টা চালাবো। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে পুরো অফিসের সেটআপ পরিবর্তন করেছি। সব অনলাইন করা হয়েছে। ভেরিফিকেশনের জন্য কিউ আর কোড দেয়া আছে; সেটা দিয়ে ভেরিফিকেশন করতে পারবেন যে, বইটি আসল নাকি জাল।
বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. ইব্রাহিম খলিল মানবজমিনকে বলেন, এএবি যে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে এর আইনগত বৈধতা নেই।
বিআরটিএ’র অনুমোদন না নিয়েই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট পেতে আবেদনকারীর অবশ্যই বিআরটিএ কর্তৃক ইস্যুকৃত বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হয়। ওই লাইসেন্সের ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দেয়া হয় এবং এজন্য নতুন করে কোনো ড্রাইভিং পরীক্ষা দিতে হয় না। আবেদনকারীদের নির্ধারিত আবেদনপত্র, বিআরটিএ’র লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি, পাসপোর্টের কপি এবং নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়।
এ বিষয়ে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, গ্রাহকরা সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা এগুলো তদারকি করছে, তাদের সঙ্গে যোগসাজশে তারা এগুলো করতে সুযোগ পাচ্ছে। যারা তদারকি করে তারা যদি এগুলো নির্মূল করতে পারতো ওই ব্যক্তি কিন্তু এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারতো না বা তার শাস্তিটা হতো।
