নেসকো নিয়ে দুই মন্ত্রীর কথার লড়াই রাজনীতিতে উত্তাপ

নেসকো নিয়ে দুই মন্ত্রীর কথার লড়াই রাজনীতিতে উত্তাপ

ফন্ট সাইজ:

নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা বিতর্ক এবার নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু বুধবার এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় কোনোভাবেই রাজশাহী থেকে সরানো যাবে না।

প্রয়োজন হলে তিনি নিজেই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন। অনেকেই মনে করছেন, নেসকো এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি রাজশাহীর মর্যাদা, প্রশাসনিক গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে আসছে নেসকো। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধান কার্যালয়টি বগুড়ায় স্থনান্তরের আলোচনা শুরু হয়। বগুড়ার শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টি সামনে এনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানান। তার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। সে সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করে এবং রাজনৈতিক নেতারাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান। স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম তখন জানান, আপাতত প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ থেকে সরে এসে তিনি বগুড়ায় একটি আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর আবারো নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। গত ১৬ই জুলাই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে রাজশাহী থেকে প্রধান কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। চিঠির খবর প্রকাশ হওয়ার পর রাজশাহীর মানুষের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয় যে, বিষয়টি এখনো নীরবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে।

এরইমধ্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, রাজশাহীর মানুষ সারাদিন চিৎকার করে। অথচ পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিদ্যুৎ সার্ভিস। আপনাদের এত ব্যথা লাগে কেন? ব্যথা লাগাবেন না ভাই। হোক না বগুড়ায় হেড অফিস, আপনারা জোনাল অফিস নেন। একই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘যতই সমালোচনা করেন, পার্লামেন্টে বলেন বা বাইরে বলেন, আমিসহ বগুড়ার সাতজন এমপি বগুড়ার উন্নয়নের ব্যাপারে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই। প্রতিমন্ত্রীর এসব মন্তব্য রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী মহলে প্রশ্ন ওঠে, উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অন্য জেলায় সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কী? তার এই বক্তব্য রাজশাহীতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ এটিকে রাজশাহীর প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে উল্লেখ করেন। এই পরিস্থিতিতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, শুধু নেসকো নয়, রাজশাহীর কোনো প্রতিষ্ঠান এখান থেকে সরানোর সুযোগ নেই।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তিনি নিজেই আন্দোলনে নামবেন। বক্তব্যের সময় তিনি অতীতের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৯২ সালে তিনি রাজশাহীর মেয়র থাকাকালে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সে সময় তিনি অনশন, মিছিল ও আন্দোলনের মাধ্যমে সেই উদ্যোগ প্রতিহত করেছিলেন। তার ভাষায়, যেভাবে পশ্চিমাঞ্চল রেল রাজশাহী থেকে যেতে দেননি, ঠিক সেভাবেই নেসকোকেও যেতে দেবেন না। মিনু আরও বলেন, তার কাছে মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যের পদ বড় নয়; রাজশাহীর স্বার্থই সবচেয়ে বড়। এই মাটিতেই তার জন্ম, এই মাটিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান।

তাই রাজশাহীর স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত দর্শকরা করতালির মাধ্যমে তাকে সমর্থন জানান। পরে বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ভূমিমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নেসকোর প্রধান কার্যালয় রক্ষার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিতে শুরু করেছেন। স্থানীয় বিএনপি’র নেতারাও প্রয়োজন হলে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে জামায়াত, এনসিপি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন