২৩ বছরের ২৭ বার আগুন

সুন্দরবন রক্ষায় বনবিভাগের ‘জিরো টলারেন্স’

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনকে অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচাতে এবার কঠোর অবস্থানে বনবিভাগ। বারবার আগুনে বনের অপূরণীয় ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রবেশপথে বিড়ি-সিগারেটসহ সব ধরনের দাহ্য পদার্থ নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই বনের পূর্ব বিভাগে জারি করা হয়েছে এ বিশেষ সতর্কতা। গত ২৭ বছরে ২৩ বার আগুন লেগেছে। কিন্তু কখনোই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। বৃহস্পতিবার থেকে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী ও শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। যা এখনো চলমান রয়েছে। বনসংলগ্ন লোকালয় ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মাইকিং করার পাশাপাশি পোস্টার লাগিয়ে সর্বসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া এলাকা বা কিছু এলাকাবাসীকে সচেতন করতে মসজিদে মসজিদে ইমামরা জানিয়ে দেন। বনের অভ্যন্তরে প্রবেশকারী জেলে ও বাওয়ালিদের দাহ্য পদার্থ বহনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সরাসরি দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। ?বনবিভাগের তথ্যমতে, গত ২৩ বছরে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে মোট ২৭ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ১০০ একর বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ২০১৭ সালে ২৬মে চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী ফরেস্টেশন সংলগ্ন আব্দুল্লার শিলা এলাকায় আগুনে পুড়ে ৫ একর বনভূমি, ২০২১ সালের ২৩শে মে দাশের ভাড়ানী এলাকায় আগুনে ৪ একর, ২০২৪ সালে ২২শে মার্চ আমড়াবুনিয়া এলাকায় আগুনে ৪ কি.মি এলাকা আগুনে পুড়ে, এছাড়া ২০২৫ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের কলমতেজী এলাকায় ২২শে মার্চ ও ২৩শে মার্চ ধানসাগর স্টেশনের টেপার বিল? ও শাপলার বিল এলাকার আগুনে প্রায় ১০ একর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, এসব অগ্নিকাণ্ডের পেছনে মানুষের অসচেতনতা, সুন্দরবনের বিল এলাকায় আগুন দিয়ে কয়লা তৈরি করে মাছ সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র ও স্থানীয় একশ্রেণির দুর্বৃত্ত চক্রের হাত রয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার বনসংলগ্ন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ জিউধরা, চিলা, জয়মুনি, কপিলমুনি ও কটকা দিয়ে প্রবেশের সময় বিড়ি-সিগারেট, দিয়াশলাই বা অন্য কোনো দাহ্য বস্তু বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বনের পাতা শুকিয়ে যাওয়ায় একটি ছোট আগুনের স্ফূলিঙ্গও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সুন্দরবনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য টহল জোরদার করা হয়েছে। বনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও রাজাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নান্না মিয়া বলেন, সুন্দরবন আমাদের এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ঝড়-বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে আমাদের আগলে রাখে। তাই এ বনকে রক্ষা করা আমাদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। বনকে রক্ষা করতে হলে দুষ্কৃতিকারীদের কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। তিনি বলেন, ?সুন্দরবন কেবল গাছপালার সমাহার নয়, এটি একটি সমৃদ্ধ প্রাণভাণ্ডার। এখানে সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অসাধু চক্রের বিষ দিয়ে মাছ ধরার কারণে বনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এক সময়ের ৪০০ প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমে এখন ২৭০-এ দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনের মধু জগতবিখ্যাত।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বিগত ২৫ বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমরা এবার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছি। সর্বত্র মাইকিং ও লিফটের বিতরণসহ মসজিদ, হাট-বাজার ও মহল্লায় সচেতনামূলক কথা বলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া বনসংলগ্ন স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া এ বিশাল বন রক্ষা করা অসম্ভব। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষা করতে না পারলে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন