বিশ্বের সর্ববৃহৎ পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি আয় বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৭৫ শতাংশ কমেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এ সময়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের বস্ত্র ও পোশাক দপ্তর (ওটেক্সা)’র প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রকাশিত ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক পোশাক আমদানি ৮.০৪ শতাংশ কমে ৩৫.০৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে; যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩৮.১৫ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়াকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের রপ্তানি কমলেও আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রতিযোগী তিন দেশের। কম্বোডিয়া; সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করে রপ্তানি ১২.৩২ শতাংশ বাড়িয়ে ২.১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। ইন্দোনেশিয়া; ৩.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে রপ্তানি ২.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ভিয়েতনাম; ১.০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে ৭.৮৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ থেকে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানি ৫.৭৫ শতাংশ কমে ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে (গত বছর যা ছিল ৪.২৫ বিলিয়ন ডলার)। তবে
স্বস্তির বিষয় হলো- বাংলাদেশের পতন চীন (৩৭.৬৯%) ও ভারতের (২৫.২৭%) তুলনায় বেশ কম। পাশাপাশি মেক্সিকো (-১০.৭৭%), হন্ডুরাস (-৯.১৪%) ও পাকিস্তানের (-৩.৫০%) রপ্তানিও কমেছে।
রপ্তানি হ্রাসের মূল কারণ: যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমার পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতি। উচ্চ উৎপাদন খরচ। মার্কিন শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা। জ্বালানি সংকট। ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডার। সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা।
সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে থাকায় ক্রেতারা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্রেতাদের বড় আদেশের বদলে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডার দিতে বাধ্য করছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো যখন বাজার হিস্যা বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আমাদের অংশীদারিত্ব আরও সংকটে পড়বে। তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমানো।
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উল্লেখ করেন, দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্রেতারা এখন সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশে অর্ডার ভাগ করে দিচ্ছেন, যার সরাসরি সুফল পাচ্ছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো।
