নতুন একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ মাস না যেতেই ‘ব্যর্থ’ বলে তকমা দেয়াকে ভীষণ রাজনৈতিক সামাজিক অসহিষ্ণুতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে পআয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন বিএনপি’র মহাসচিব। ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজক টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল (টিসিই)। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা তো একটুতেই অস্থির। আজকে পাঁচ মাসও হয়নি, এই সরকারকে এখনই বলছি যে সরকার ব্যর্থ, এটা আসলে এত অসহিষ্ণুতা, ভীষণভাবে অসহিষ্ণুতা।’ টেকসই গণতন্ত্রের জন্য ধৈর্য ও পরমতসহিষ্ণুতা জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। তাই অল্প সময়েই সরকারকে ব্যর্থ বলা, রাজপথে নেমে অস্থিরতা তৈরি করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপি’র মহাসচিব বলেন, যারা বলছেন সরকারকে পাঁচ বছর পার করতে দেবেন না, তারা ফ্যাসিস্ট আমলে শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কথার কোনো পার্থক্য নেই। ঐতিহাসিকভাবে যখনই বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, দলটি দেশকে একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পেয়েছে। তিনি বলেন, এটা যেন উত্তরাধিকারসূত্রে বিএনপি সব সময়ই পেয়ে আসছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে ১৫ বছর। শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের নাম করে একেবারে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন। গণতন্ত্রের প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্তরণ সময়ের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাতের সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। ধৈর্য ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদমাধ্যমের সংকট ও মালিকদের নির্ভরশীলতা প্রসঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক সম্পাদককে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের এসব সংকট কাটাতে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। গণমাধ্যম মালিকরা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ভয়াবহ রকম বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের পুরো জীবনের অবদান এক মুহূর্তে নষ্ট করা হচ্ছে। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
সেমিনারে প্রধান আলোচক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যমকে সমৃদ্ধ করতে মালিক, সরকার, বিজ্ঞাপনদাতা ও পাঠকের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক বুঝতে হবে। দেশে বেসরকারি ব্যবসা ও উৎপাদন না বাড়লে বিজ্ঞাপন আসবে না, যা সংবাদশিল্প টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি। বিগত আমলে সরকার ও মালিকপক্ষের আঁতাতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখন নিয়ন্ত্রণ না করে সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরির কাজ ইতিমধ্যে হাতে নিয়েছে। এই কাজে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব সামলে গণমাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে বলে জানান জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, তবে ব্যবসার সুযোগ দেয়ার শর্ত হিসেবে সাংবাদিকদের জন্য সম্মানজনক ওয়েজ বোর্ড, ন্যায্য বেতন ও কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে মালিকপক্ষকে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল। তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য। গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ বা অন্ধ অনুগত না হয়ে জনগণের স্বার্থে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। অতীতের সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা, ন্যায্য বেতন ও স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিতে ১০টি নীতিগত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন মোস্তফা আকমল। সেমিনারে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন টিসিইর সদস্য সচিব সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অন্যের প্রতিপূরক। তিনি প্রত্যাশা করেন, এই সেমিনার ভবিষ্যতে দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইংরেজি দৈনিক ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বিএনপি সরকারের বিগত ছয় মাসে গণমাধ্যম চমৎকার স্বাধীনতা উপভোগ করছে। কোনো গণমাধ্যম বলতে পারবে না, তাদের কাজে সরকার কোনো বাধা সৃষ্টি করছে। তবে গণমাধ্যম কতোটা সুষ্ঠু সাংবাদিকতা করছে, সেটাও এখন দেখতে হবে। গণমাধ্যমে জবাবদিহির সংস্কৃতি চালু করতে হবে। বর্তমান সরকারের যেসব ইতিবাচক কর্মকাণ্ড আছে, সেসব গণমাধ্যমে সেভাবে প্রচার হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, যখন টেকসই গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, তখন একইসঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে জোরেশোরে বলতে হবে। দেশে দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ গণমাধ্যম হয়তো সরকার, নয়তো কোনো দল কিংবা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে।
অনেক সময় ভিউ বাড়ানোর আশায় অনেক গণমাধ্যম বক্তা যা বলেননি, তা প্রচার করে বলে মন্তব্য করেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। তিনি বলেন, আবার কখনো বক্তার আংশিক কথা প্রচার করা হয়। এই প্রবণতা থেকে বের হতে হবে।
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের যে উদ্যোগ, সেটা ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকতা যারা করেন, সামাজিকভাবে তাদের একটা ক্ষমতাচর্চা করতে দেখা যায় সব সময়। এই ক্ষমতাচর্চা কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সেটা নিয়ে এখন ভাবতে হবে। তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে বিবেকের সমন্বয় করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন টিসিইর আহ্বায়ক আব্দুল হাই সিদ্দিক। আরও বক্তব্য দেন যমুনা টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফকরুল আলম, এখন টেলিভিশনের সিইও আখতারুজ্জামান বাবু প্রমুখ।
