চলতি বছরের ২রা জানুয়ারি রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন বিএনপিকর্মী আহাদ আলী ওরফে গোলকাজল। নিখোঁজের ১৮ দিন পর পদ্মা নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় তার মরদেহ। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাশের সুরতহাল প্রস্তুতের সময় শরীরের কয়েকটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এ ছাড়া আহাদের দাঁত ভাঙা ছিল। ময়নাতদন্ত রিপোর্টেও হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহত আহাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেন ওরফে ফিরোজের ছেলে। নিখোঁজের পর ৮ই জানুয়ারি স্বামীকে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে আটজনের নাম উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন আহাদের স্ত্রী লিসা বেগম। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম মেম্বার।
এদিকে মামলাটি দায়েরের পর আসামিপক্ষ মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে। সংবাদ সম্মেলে চরবাডাঙ্গা ইউপি সদস্য রফিক মোল্লা দাবি করেন, ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের নাড়ুখাকি এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে আহাদ নিখোঁজ হন। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয় পদ্মা নদীতে। খুনিরা এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হওয়ার গল্প সাজান। কিন্তু ৭ মাসেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। এমনকি মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও এগোয়নি তদন্ত। সবশেষ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হরেন্দ্রনাথকে পাল্টে আব্দুর রাজ্জাককে দেওয়া হয়েছে। তারপরও কোন অগ্রগতি নেই। প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আসামিরা। এতে আহাদের পরিবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন মামলার বাদী। আগামী ১২ই আগস্ট আদালত শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে রয়েছে নানান অমীমাংসিত প্রশ্ন। সেগুলো হলো-আহাদ পেশায় গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। ভারত থেকে গরু পাচার চক্রের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল, তাহলে এই হত্যাকাণ্ড কি ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্বে। যারা সংবাদ সম্মেলন করে আহাদ নিখোঁজের বিষয়টিকে নৌকাডুবির ঘটনা বলে গল্প সাজিয়েছিলেন, এটি তাদেরও পরিকল্পিত হতে পারে? এছাড়াও ভিলেজ পলিটিক্সে একটি পক্ষের অনুসারী ছিল আহাদ, তাহলে কি এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এরআগে সংঘটিত আলোচিত পিন্টু হত্যা মামলারও আসামি ছিলেন আহাদ, এটি প্রতিশোধও হতে পারে। এসব প্রশ্নের সদুত্তর পেলেই হত্যার রহস্য উদঘাটন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ মামলা হওয়ার পর ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেন আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, তাঁতী লীগ নেতা নুরুল ইসলামসহ ৬ আসামি। বিচারপতি মো. কামরুল হোসাইন মোল্লা ও ফয়সাল হাসান আরিফের বেঞ্চ তাদের ৬ সপ্তাহের জামিন দেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের ৫ এপ্রিলের মধ্যে দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করার কথা। তবে তারা আত্মসমর্পণ করেননি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালতের আইনজীবী নুরে আলম সিদ্দিকী আসাদ বলেন, জামিনের মেয়াদ শেষ, মানে সয়ংক্রিয়ভাবে জামিন বাতিল।
একই সঙ্গে তারা উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছে। আইন অনুযায়ী তাদের গ্রেপ্তারে বাঁধা নেই। নিহত আহাদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুব হাসান জানান, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বলছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। আঘাতগুলো ছিল মৃত্যুর আগে সংঘটিত ও হত্যাকাণ্ডমূলক। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তাকে পানিতে ডুবানো হয়। নিহতের নিতম্বের উপরে কাটা ক্ষত, মাথার পেছন ও বুকে ক্ষত চিহ্ন ছিলো। সারা শরীরে মারাত্মক পচনের কারণে আঘাতের সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায়নি। নিহতের স্ত্রী বলেন, স্বামী হত্যাকাণ্ডের ৭ মাস পেরোলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের ধরছে না। থানা পুলিশের গাফিলতি রয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, মামলাটি সিআইডিতে বদলির জন্য আদালতে আবেদন করেছি। মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তবে আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছে। মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে, গাফিলতির অভিযোগ সঠিক নয়।
