কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এডভোকেট বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছেন, আমার ধারণা হাওর অঞ্চল একদিন পর্যটনের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এলাকায় পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সবাই মিলে এই হাওর অঞ্চলকে এমন একটি সুন্দর এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবো যেন মানুষ একটু অবসর কাটানোর জন্য অবশ্যই হাওর অঞ্চলে আসবে। হাওর এলাকাকে আমরা প্রকৃতির সন্তান হিসেবে গড়ে তুলবো। আগামীর পর্যটন ঠিকানা হবে হাওর অঞ্চল। সমস্ত বাংলাদেশের মানুষকে আমরা আহ্বান করবো অবসর কাটানোর জন্য অন্তত একদিনের জন্য হলেও হাওর অঞ্চলে আসুন।
শুক্রবার বিকালে ইটনা জিরো পয়েন্টে কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যদের সম্মানে আয়োজিত হাওর ভ্রমণ উপলক্ষে প্রীতি সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেট সদস্য ফজলুর রহমান এমপি এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী এই হাওর ভ্রমণে কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ড. মো. হাবীবুর রহমান, উপ-উপাচার্য ড. জি.এম. শফিউর রহমান, ট্রেজারার ড. মো. আব্দুস সালাম আকন্দ, রেজিস্ট্রার নায়লা ইয়াসমিন এবং সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. ফেরদৌস হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম, জেমস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বপন বড়ুয়া চৌধুরী, আলফা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর আহমেদ এফসিএ এবং কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির অংশ নেন।
এ ছাড়া সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের সহধর্মিণী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখার বিশেষ আমন্ত্রণে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা হাওর ভ্রমণে যোগ দেন। কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ড. মো. হাবীবুর রহমান বলেন, হাওর ভ্রমণে এসে এখানকার অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে অত্যন্ত ভালো লেগেছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের স্বাদও অতুলনীয়। এখানে না আসলে হাওরের অসাধারণ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারতাম না। আমরা প্রতি বছর হাওরের এই আনন্দটা পেতে মুখিয়ে থাকবো। সংগীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, হাওর ভ্রমণে এসে আমি অভিভূত। এখানে এসে মনটা আনন্দে ভরে গেছে। এখানে না এলে হাওর বাংলার অসাধারণ প্রকৃতির সঙ্গে হয়তো এই জীবনে আমার পরিচিত হওয়া হতো না। প্রকৃতি যেন নিজের সবটুকু উজাড় করে হাওরকে অনন্য রূপ ও স্নিগ্ধতা দিয়েছেন। এর আগে সকালে জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখোলা ঘাট থেকে বিশাল আকারের ট্রলারে করে শুরু হয় হাওর ভ্রমণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছাড়াও শিক্ষক-কর্মচারী, সংস্কৃতিকর্মীদের ৭০ জনের একটি বহরের হাওর ভ্রমণের যাত্রাপথের উদ্দেশ্য ছিল ইটনার আড়ালিয়া হাওর।
চারদিকে শুধু জল আর জল। দিগন্তজোড়া বিস্তৃত হাওর, তার বুক চিরে এগিয়ে চলে ট্রলারটি। কখনো ঢেউয়ের দোল, কখনো নীল আকাশের ছায়া, আবার কখনো দূরের সবুজ জনপদ; প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মাঝে যেন হারিয়ে যাওয়ার এক অন্যরকম আয়োজন। ট্রলারে করে হাওরের জলে ভাসতে ভাসতে বিশাল হাওরের বুক চিরে চলার পুরো সময়টাই ছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর। চারপাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী লাভলী দেব, ম্যাজিক বাউলিয়ানা চ্যাম্পিয়ন সোহাগ নূরী এবং স্থানীয় কয়েকজন সংগীতশিল্পী তাদের কণ্ঠের মাধুর্যে মাতিয়ে রাখেন নৌভ্রমণের পুরোটা সময়। গান আর গল্পে, হাসি-আনন্দে কখন যে পথ পেরিয়ে যাচ্ছিল, তা যেন টেরই পাচ্ছিলেন না কেউ। হাওরের বুকের এই ভ্রমণে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্পও। সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান শোনান আড়ালিয়া গ্রামের হাওরপাড়ের লোককথার অমর প্রেমগাঁথা মহুয়া-মলুয়ার কাহিনী। সেই কাহিনীর পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবন-সংগ্রামের নানা কথা। একইসঙ্গে তিনি তুলে ধরেন ঐতিহ্যবাহী দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ ও কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস ও ইতিকথা। যে দু’টি প্রতিষ্ঠানেরই ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন ইটনা উপজেলার দুই সূর্যসন্তান ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম র্যাংলার ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু ও কৈবর্তরাজ গুরুদয়াল সরকার। সংগীত ভুবনের উজ্জ্বল নক্ষত্র ইটনার আরেক কৃতীসন্তান দেবব্রত বিশ্বাসের কথাও তুলে ধরেন ফজলুর রহমান।
উপজেলার সবচেয়ে বড় হাওর আড়ালিয়া হাওরটি প্রায় দুই ঘণ্টায় পেরিয়ে দেখা মিলে ধনপুরের বিখ্যাত ছান্দিনা বিলের পাশে নোঙর করে ট্রলারে বসেই ফজলুর রহমান এমপিকে নিয়ে অতিথিরা গ্রহণ করেন দুপুরের খাবার। খোলা আকাশের নিচে, চারপাশে অথই জল আর হাওরের নির্মল বাতাসে দুপুরের খাবারও যেন তখন পরিণত হয় স্মরণীয় এক আয়োজনে। প্রকৃতি, গান, গল্প আর ইতিহাস- সবমিলিয়ে হাওর ভ্রমণটি হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। শুধু চোখে দেখা নয়, হাওরের সৌন্দর্য যেন ছুঁয়ে যায় সবার হৃদয়কেও। দুপুরের খাবার শেষে ভ্রমণকারীরা যাত্রা করেন ধনপুরের কাঠুইর গ্রামের দিকে। গ্রামটিতে গিয়ে তারা পরিদর্শন করেন গুরুদয়াল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা গুরুদয়াল সরকারের বাড়ি। সেখান থেকে ট্রলারে করে ইটনা সদরে যান ভ্রমণকারীরা। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকাল। সেখানে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার অংশের ইটনার জিরো পয়েন্ট এলাকা পরিদর্শন করেন তারা। হাওরের মৃদুমন্দ বাতাসে শরীর জুড়ায় সকলের। দিনভর হাওরের বিশালতা, সৌন্দর্য আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকার পর সবার চোখেমুখে ছিল মুগ্ধতার ছাপ। হাওর শুধু জলরাশি নয়, এটি এক জীবন্ত প্রকৃতি, এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আর সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতি। সেই হাওরের বুক চিরে নৌভ্রমণের এই আয়োজন যেন সবাইকে নতুন করে চিনিয়েছে ভাটির জনপদকে।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, হাওরের জলে তখন ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আলো। ফিরতি পথে ট্রলারটি বালিখোলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলে আপন গতিতে। কিন্তু ভ্রমণ শেষে সবার হৃদয়ে থেকে গেছে একটি অনুভূতি- হাওরের জল ছুঁয়ে দেখা যায়, তার সৌন্দর্য চোখে দেখা যায়; কিন্তু হাওরের মায়া থেকে বেরিয়ে আসা যায় না।
