প্রথম আলো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার শিরোনাম ‘ড. ইউনূসকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার চেষ্টা হয়েছিল’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সেনা সদর ও বঙ্গভবন, রাতে কার্জন হলে ছাত্রদের সঙ্গে এবং পরদিন ৬ আগস্ট বঙ্গভবনে বৈঠক, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান করা, উপদেষ্টাদের তালিকা তৈরিসহ সে সময়ের অনেক ঘটনার সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সেসব দিনের ঘটনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো: দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনামলে আপনি ছিলেন অন্যতম প্রধান দৃশ্যমান সমালোচকদের একজন। সেই অবস্থান থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আপনার যুক্ত হওয়াটা কীভাবে ঘটল?
আসিফ নজরুল: আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতাম, টক শোতে যেতাম, সভা-সেমিনারে যেতাম এবং রাজপথের আন্দোলনেও অংশ নিতাম। আর আমি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রদের সঙ্গে সব সময় একটা যোগাযোগ ছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আমি থাকব—এটাই স্বাভাবিক ছিল।
প্রথম আলো: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন সম্পর্কে কতটা আশাবাদী ছিলেন?
আসিফ নজরুল: ধীরে ধীরে আশাবাদী হয়েছি। এর আগে বহু আন্দোলন হয়েছে, একটা হতাশা চলে এসেছিল। সরকারের পতন হবেই—এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি, যখন আর্মিরা বলল যে তারা জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। ১৭ জুলাই আমরা শিক্ষকেরা শাহবাগ থানা থেকে দুজন ছাত্রকে ছাড়িয়ে আনি। এ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সমাবেশও হয়, ১৯ জুলাই শাহবাগে অভিভাবকদের সমাবেশ হয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সমাবেশ বা মিছিলে থাকতাম। ২ আগস্টের দ্রোহযাত্রায় ছিল সর্বস্তরের মানুষ। এসব সমাবেশে এমন মানুষদের দেখতে পাই, যাঁরা আগে কখনো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেননি। আর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এসে মনে হলো, অনেকের মধ্যেই এই বোধ সঞ্চালিত হয়েছে, যত মানুষ মারা যাক, যা কিছু হোক, রাজপথ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না।
আরেকটা বিষয় খুব রিমার্কেবল লেগেছিল। আমি অতীতে অনেক আন্দোলনে ছিলাম। কিন্তু খুব ডিস্টিংক্টলি বলতে পারি, এই অভ্যুত্থানের শেষ দিকে এসে লক্ষ করলাম, আমার মধ্যে কোনো মৃত্যুভয় কাজ করছে না। অসংখ্য তরুণ মারা যাচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা মাকে চিঠি লিখে রাজপথে নেমে যাচ্ছে, একটা সাধারণ মেয়ে রিকশায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমার ব্যক্তিগত মৃত্যু কোনো ঘটনাই না। সম্ভবত এ জন্য ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সমাবেশে বলেছিলাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব।
তরুণ বয়সে মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনে খুব অদ্ভুত লাগত। মানুষ মরে যেতে পারে জেনেও কীভাবে যুদ্ধে যায়! এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বুঝেছি এই ফিলিংসটা কত সত্যি এবং এটা আমার নিজের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এটা একটা বিস্ময়কর আবিষ্কার।
প্রথম আলো: শোনা যায়, জুলাইয়ের শেষ দিকে আপনাকে সতর্ক করা হয়েছিল।
আসিফ নজরুল: জি! হঠাৎ গভীর রাতে ফুলার রোড পাড়ার গেট থেকে বলা হলো, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এসেছেন, আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি নামলাম। একপর্যায়ে কিছুটা আড়ালে গিয়ে উনি স্বীকার করলেন, উনি ব্র্যাকের শিক্ষক নন, সেনাবাহিনীর লোক। বললেন, স্যার, আমরা খবর পেয়েছি শেখ হাসিনার পক্ষে স্নাইপাররা নেমেছে, দূর থেকে লোকজনকে গুলি করছে। আর যেকোনো সময় আপনাদের যাঁরা নেতৃস্থানীয় আছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ব্যাপারটা আমি খুব সিরিয়াসলি নিইনি, কিন্তু পরে সিনিয়র দু-একজনকে এটা জানালে তারা বলল, হ্যাঁ, খুব সম্ভবত আর্মি থেকেই কেউ এসেছিল।
এরপর ৪ আগস্ট রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আরেকজন এসে আকুলভাবে অনুরোধ করেন, আমি যেন রাতে বাসায় না থাকি। আমাকে আর বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে নাকি মেরে ফেলা হবে। আমার স্ত্রী শীলা খুবই ভয় পেয়ে যায়। সে রাতে আমি ফুলার রোডেই অধ্যাপক মোস্তফা আল মামুনের বাসায় থাকি।
প্রথম আলো: জুলাইয়ের শেষ দিকে সতর্ক করার ঘটনা কত তারিখের? মনে পড়ে?
আসিফ নজরুল: না; কারণ, আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি তখন। কিছু লিখেও রাখতাম না। তবে যত দূর মনে পড়ে, ২৪/২৫ জুলাই হতে পারে।
৫ আগস্ট সরকার পতন
প্রথম আলো: সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট সেনা সদরে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে আপনি ছিলেন একমাত্র নাগরিক প্রতিনিধি। দিনটা শুরু হয়েছিল কীভাবে?
আসিফ নজরুল: ঠিক ছিল ৫ আগস্টেও সমাবেশ হবে। আমরা জানি না সেদিনই সরকারের পতন হবে; তবে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি, শেখ হাসিনা আর টিকতে পারবেন না। আমি রেডি হচ্ছি, তখন একটা ফোন এল। স্ক্রিন দেখে বোঝা যাচ্ছিল, আর্মির ফোন। সালাম দিয়ে বলল, স্যার, আপনাকে একটু আর্মি হেডকোয়ার্টারে আসতে হবে। তখন বোধ হয় বেলা একটার মতো বাজে।
টেলিভিশনে ঘোষণা হয়ে গেছে, আর্মি চিফ (জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, সেনাপ্রধান) বক্তৃতা দেবেন। আমার সন্দেহ লাগল। জিজ্ঞেস করলাম পলিটিশিয়ানরা থাকবেন? মির্জা ফখরুল ভাইয়ের (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির মহাসচিব) নাম বলল। ফোন রেখে ফখরুল ভাইকে ফোন করলাম; উনি বললেন, আমি তো অন দ্য ওয়েতে আছি। আপনি আসেন, কোনো অসুবিধা নেই। রিজওয়ানা হাসানকে (সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বেলার প্রধান নির্বাহী; পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা) ফোন দিলাম, বলল, আপনি অবশ্যই যাবেন।
ইতিমধ্যে শীলা জেনে গেছে, সে ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করল, তোমাকে বোধ হয় মেরে ফেলবে! তাকে ফখরুল ভাইয়ের কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। একটু পরে আর্মি একজন মেজরকে পাঠাল আমাকে নিতে। সে নাকি আমার ডিপার্টমেন্টে কয়েক মাস পড়েছিল। গেটের কাছে সে শীলাকে বলল, ম্যাডাম, আপনি আমার ছবি তুলে রাখেন, গাড়ির ছবি তুলে রাখেন, কোনো অসুবিধা নেই। তারপর আমরা যাত্রা শুরু করলাম। সেটা ছিল একটা অসম্ভব যাত্রা!
জিগাতলা পার হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর মোড়ের কাছে হঠাৎ দেখি অসংখ্য মানুষ। হাতে উঁচিয়ে ধরা লাঠি, শোরগোল। আর্মির গাড়ি থামল; ওরা ভাবছিল ইউ-টার্ন নেবে কি না। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা আওয়ামী লীগের, নাকি আন্দোলনকারী? তারা বলল, স্যার, আওয়ামী লীগ পাবেন কোথায়? এরা সব আন্দোলনকারী।
গাড়ি থেকে নেমে হাত তুলে ‘আমি আসিফ নজরুল’ বলতে বলতে এগোচ্ছিলাম। আন্দোলনকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়ল; হঠাৎ দেখলাম তারা আমাকে চ্যাংদোলা করে ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে প্লেয়াররা যেমন কোচকে মাথায় নিয়ে ছোড়াছুড়ি করে, আমি একেকজনের মাথার ওপর ঘুরছি।
তারপর তারা আমাকে ছেড়ে দিলে গাড়ি জোরে চলা শুরু করল। সামনে পুরো রাজপথ খালি। জায়গায় জায়গায় আর্মির ব্যারিকেড; রাস্তায় ইটের চিহ্ন, ছেঁড়া কাপড়, জুতা, ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কিন্তু কোনো মানুষ নেই।
প্রথম আলো: সেনা সদরে ঢুকে কী দেখলেন?
আসিফ নজরুল: একটা বড় রুম। সভাপতির আসনে আর্মি চিফ, সঙ্গে সম্ভবত নেভি আর এয়ারফোর্স চিফও ছিলেন, দুই পাশে সারিতে আট-নয়জন করে নেতা। ফখরুল ভাইকে দেখলাম, মির্জা আব্বাস (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) ছিলেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এসে পরিচিত হলেন; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও ছিলেন। মামুনুল হক (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব), ইসলামী আন্দোলনের ফয়জুল করীম (নায়েবে আমির) ছিলেন; কিছুক্ষণ পর জোনায়েদ সাকি (তখন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক, বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী) এল। জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ওই আলোচনায় বেশ ভোকাল ছিল।
তখন ডিবেট চলছে, সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে কি, হবে না। আর্মি চিফ ওয়াকার সাহেব আমাকে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনি বলেন। আপনি তো টিচার। আমি বললাম, অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এটা তো কোনো সংসদ না, ভুয়া নির্বাচনে গঠিত। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বললেন, সংসদ ভেঙে দিলে সংকট হতে পারে। তখন বিএনপি আর জামায়াতের নেতারা খুব স্ট্রংলি বললেন, না, ভেঙে দিতে হবে।
একপর্যায়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, শেখ হাসিনার কী অবস্থা? বলা হলো উনি পদত্যাগ করবেন, উনি আর থাকবেন না। এ রকম একটা অবস্থায় একজন বলল, আমি যেন জনগণকে একটু শান্ত হতে বলি। বেলা তিনটার দিকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, আপনারা শান্ত হন, আমাদের জন্য অনেক বড় একটা গুড নিউজ আসছে।
প্রথম আলো: শেখ হাসিনা যে দেশ ছেড়েছেন, সেটি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?
আসিফ নজরুল: ওয়াকার ভাইয়ের পেছনের দেয়ালে টেলিভিশন চলছিল। হঠাৎ দেখি দেখাচ্ছে, শেখ হাসিনা বিমানে করে চলে যাচ্ছেন। গিয়েছিলেন হয়তো আগেই, কিন্তু দেখাচ্ছিল যখন, তখন বোধ হয় সাড়ে তিনটা হবে। আমি বললাম, শেখ হাসিনা তো চলে যাচ্ছেন! ওয়াকার ভাই একটু বিস্মিত হয়ে পেছনে ঘুরে টেলিভিশনের দিকে তাকালেন। বললেন, চলে গেছেন! উনি মেবি জানতেন যে হাসিনা চলে যাবেন। কিন্তু ঠিক তখনই যাবেন বা তাঁকে জানিয়ে যাবেন কি না, আমি জানি না।
প্রথম আলো: জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেনাপ্রধানের বক্তব্য সম্পর্কে বৈঠকে কি আগেই জানতেন? সেনাপ্রধান বলেছিলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছি।
আসিফ নজরুল: রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অফিসারদেরও ইনপুট ছিল। আমার সঙ্গে যখন কথা হলো, আমি বলেছি, ওয়াকার ভাই, আপনি এটা ক্লিয়ার করেন যে শেখ হাসিনা এখন আর নেই, সবাই যেন শান্ত হয়। এখন কী হবে, এটা ছাত্ররা, রাজনীতিবিদেরা বসে ঠিক করবে। আর উনি বক্তৃতায় যে বললেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমরা গঠন করতে যাচ্ছি, এটা নিয়ে আমার সঙ্গে সরাসরি কথা হয়নি। ফ্র্যাংকলি বলি, ওখানে রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ জন আর আমি একমাত্র সিভিল সোসাইটির সদস্য; আমার বেশি কথা বলতে অস্বস্তি লাগছিল।
প্রথম আলো: ওই মুহূর্তে ছাত্ররা তো বাইরে, আপনারা সেনা সদরের ভেতরে...
আসিফ নজরুল: এটা মাথায় এসেছিল। কিন্তু তখন সংসদ ভাঙার প্রশ্নটাই আমার কাছে জরুরি মনে হচ্ছিল, আর সংসদ ভাঙতে পারেন রাষ্ট্রপতি। আমি কনস্টিটিউশনাল ল পড়াই, আমি ওইভাবেই ভেবেছি। বঙ্গভবনের দিকে যাওয়ার পথে আর্মিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না। বলা হলো, চেষ্টা চলছে।
আরেকটা কথা বলে রাখি, শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগবে। এই গণ–অভ্যুত্থানকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ ছিল না; যোগাযোগ থাকত শুধু নুর (নুরুল হক নুর, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি, এখন প্রতিমন্ত্রী) আর আখতারের (আখতার হোসেন, তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির সংসদ সদস্য) সঙ্গে। ওদের প্রথমেই গ্রেপ্তার করে ফেলা হয়। আর নাহিদের (নাহিদ ইসলাম, গণ-অভ্যুত্থানের নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, এখন এনসিপির সংসদ সদস্য) সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল। রাতের বেলায় হাসপাতালে, ১৫ জুলাই হতে পারে। নাহিদ চলে যাচ্ছিল, আমি ওকে ডেকে সাবধানে থাকতে বললাম। আর বললাম, বাবা, ‘আমি রাজাকার, রাজাকার’ এই স্লোগানটাই শুধু দিয়ো না, মানুষ কনফিউজড হবে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা এখন কী করবে? বলল, স্যার, আমরা আবার আন্দোলনের ঘোষণা দেব, আমাদের থামার কোনো সুযোগ নেই। ওকে দেখে খুব মায়া লাগছিল।
আর ৫ আগস্টের ওই দুপুরে কয়েকজন রাজনীতিক আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, এখন কনস্টিটিউশনালি কী হবে? আমি বলছিলাম, আপনারা সাংবিধানিকভাবে করতে চাইলে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের মধ্যে সমস্ত অনিশ্চয়তার উত্তর আছে।
প্রথম আলো: সেনা সদরে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে সেনাপ্রধান আর কী কী বলেছিলেন?
আসিফ নজরুল: সেনাপ্রধান প্রথম মিটিংয়ের রুমটাতে স্থির ছিলেন না। তিনি কয়েকবার বের হয়েছেন, রাজনীতিবিদেরা কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে বাইরে গেছেন। বাইরের রুমে অনেক সেনা অফিসারও ছিল। আমি অনেকটা সময় ধরে টিভিতে বা অনলাইনে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল রাস্তায় আনন্দ করা মানুষের কাছে ছুটে যাই। তবে আবহাওয়া দেখে টের পাচ্ছিলাম, সংসদ ভাঙার পর সরকার কীভাবে গঠিত হবে—এটা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল।
সেনা সদর থেকে বঙ্গভবন
প্রথম আলো: ৫ আগস্ট সেনা সদর থেকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা হলো কীভাবে?
আসিফ নজরুল: রাজনীতিবিদেরা মিলে ঠিক করলেন, বঙ্গভবনে যাবেন। কারণ, সংসদ ভাঙতে পারেন প্রেসিডেন্ট; ওনার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কথাটা বোধ হয় জাতীয় পার্টি বেশি বলেছে, আর্মিও চাচ্ছিল।
প্রথম আলো: যাত্রাপথে কী হলো?
আসিফ নজরুল: যাত্রাটা ছিল অবিস্মরণীয়। ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে তখন লাখো মানুষ। সবাই চাইল আমি সামনের দিকের গাড়িতে বসি; একটু পরে জোনায়েদ সাকিও এসে উঠল। হাজার হাজার লোক, গাড়ি যাবে কীভাবে? আমি কিছু বলার পর রাস্তাটা একটুখানি ছেড়ে দিল। যেন একটা পিঁপড়া যেতে পারে, ও রকম একটা পথ। গাড়ির কাচ নামিয়ে মাথা বের করে দুই হাত জোড় করে বারবার বলছিলাম, প্লিজ, রাস্তা ছাড়েন। কেউ আমার মাথা টেনে বুকের মধ্যে নিয়ে নিল, কেউ গালে হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করল, কেউ চুলে হাত বুলাল। একজন হঠাৎ নিজের শার্টে টান দিয়ে সবগুলো বোতাম ছিঁড়ে ফেলে খুশিতে চিৎকার করে উঠল। অভাবিত দৃশ্য!
ওই যাত্রাপথে একটা বিষয় টের পেলাম। সাকিকে কে কে যেন ফোন করল। সরকারে কারা থাকবে, সেই আলাপ। আমি বললাম, সাকি, আমরা তো এখানে অথরিটি না; ছাত্রদের সঙ্গে সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করবে। সাকি আমার সঙ্গে একমত হলো। কিন্তু বুঝলাম, তখনই, ওই যাত্রাপথে যারা সরকারে যাওয়ার প্রত্যাশী বা চিন্তা করছে, তারা অলরেডি কমিউনিকেশন শুরু করে দিয়েছে।
প্রথম আলো: বঙ্গভবনে গিয়ে কী দেখলেন?
আসিফ নজরুল: বঙ্গভবনে গিয়ে দেখলাম, অ্যাজ ইফ দে আর ইনফর্মড, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেনা সদরে যেখানে ২০ জনের মতো রাজনীতিবিদ ছিলেন, এখানে প্রায় ৪০ জন। মান্না ভাইসহ (মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি) গণতন্ত্র মঞ্চের সব নেতা, বিএনপি-জামায়াতের আরও কিছু নেতা; হাসনাত কাইয়ূম ভাই (হাসনাত কাইয়ূম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি), হাসান আল মামুন (গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক), আরও অনেকে! নাগরিক প্রতিনিধি খুঁজলাম, আমি ছাড়া কেউ ছিল না সেখানেও।
তারপর চুপ্পু সাহেব (সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন) এলেন। উনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনার উপ-প্রেস সচিবকে জন্মদিনের বার্তা পাঠায়, এ রকম একটা লোক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। জবাবে উনি এক ভাষণে বলেছিলেন, আসিফ নজরুল নামে নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক শিক্ষক আছে, সে আমার সম্পর্কে যা তা কথা বলে; আমি এগুলোর পাত্তা দিই না। সেই উনি আমার কাছে এসে হাত মেলালেন, আরেক হাত দিয়ে আমার বাহু ধরে বললেন, এখনো মনে আছে, ‘আসিফ সাহেব, আপনিই তো ভরসা। কেমন আছেন ভাই?’ উনি বেশ নার্ভাস ছিলেন।
আলোচনায় ফখরুল ভাই যখন খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বললেন, প্রেসিডেন্ট বোধ হয় বলছিলেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা করা হবে। আমার বলার পালা এলে আমি বললাম, ব্যবস্থা করা হবে মানে কী? আজকেই ওনাকে মুক্তি দিতে হবে, এখনই! আর বললাম, অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে, রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সরকার গঠনের প্রসঙ্গে বললাম, যা সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, ছাত্রদের কথা অনুযায়ী যেন করা হয়। ছাত্ররাই এই আন্দোলনের নেতৃত্বে।
একটাই ডিসেন্টিং ভয়েস মনে আছে। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে জি এম কাদের সাহেব মার্শাল ল অথবা জরুরি অবস্থা জারির কথা তুলেছিলেন। তখন সবাই প্রচণ্ড প্রতিবাদ করেছিল; আমিও বলেছিলাম, কোনো অবস্থাতেই না।
প্রথম আলো: ওই বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত কী কী এল?
আসিফ নজরুল: রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে; খালেদা জিয়াকে এখনই মুক্তি দেওয়া হবে; সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে; রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে; সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে; দ্রুত শান্তিশৃঙ্খলা ফেরানো হবে। আর সবাই একমত হলো, যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, ছাত্রদের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।
অন্তর্বর্তী একটা সরকার হবে, এই আলোচনা হয়েছে; কে প্রধান হবেন, তা উচ্চারিত হয়নি। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করার। সাকি আমাকে বলল, কোনো চিন্তা করবেন না, ওরা সবাই আমার খুব ক্লোজ, আমি ব্যবস্থা করে দেব, আমরা দুজন মিলে যাব।
মিটিং শেষে আমি ওয়াকার ভাইকে আলাদা করে বললাম, আখতার আমার ছাত্র, খুব সাধারণ ঘরের ছেলে; ওর ওয়াইফ এসে আমার বাসায় কান্নাকাটি করে। আপনি ওকে আজকে রাতেই জেল থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করবেন। উনি কথা দিয়েছিলেন এবং আখতারকে ওই রাতেই ছেড়েছে।
প্রথম আলো: ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে কারা এসেছিলেন—এ নিয়ে একটা আলোচিত ঘটনা আছে।
আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, খুব বিখ্যাত ঘটনা। মিটিং প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ তিনজন ঢুকল; দুটো ছেলে, একটা মেয়ে। টেবিলের অগ্রভাগে সাড়া পড়ে গেল ‘সমন্বয়ক আসছে, সমন্বয়ক আসছে’! রাজনীতিবিদেরা দাঁড়িয়ে গেলেন, আর্মি অফিসাররা দাঁড়িয়ে গেলেন, সবাই তাদের তোয়াজ করছিল। আমি খুব অবাক, এরা কারা! পরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার আগে হাসনাত কাইয়ূম ভাই দৌড়ে এসে বললেন, আসিফ, আপনি কিন্তু এদের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন না। এখানে অনেক ঘটনা আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে; আমি তো ওদের চিনিই না। সংবাদ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম, নাহিদ, আসিফ, সারজিস (জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, সারজিস আলম) ওরা যা বলবে, সে অনুসারেই সরকার গঠন করা হবে। ওদের মতামত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। ওদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করছি।
৫ আগস্ট রাত: কার্জন হল
প্রথম আলো: সেই ৫ আগস্ট রাতেই তো কার্জন হলে ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল।
আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, অনেক কষ্ট করে। নাহিদের পক্ষ থেকে যে ছেলেটা আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তাকে ফোন করা হলো। কিছুক্ষণ পর জানাল, আসিফ স্যার, নাহিদ ভাই বলেছেন, তাঁরা শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলবেন, আর কারও সঙ্গে না। পাশে সাকি দাঁড়ানো; আমি বললাম, সাকি, কিছু মনে করবেন না। সাকি বলল, না না, কোনো অসুবিধা নাই, আপনি যান। গাড়িবহর নিয়ে গেলাম সমকাল-চ্যানেল ২৪-এর অফিসে। আর্মি অফিসাররা জিজ্ঞেস করলেন—স্যার, আমরা থাকব, না চলে যাব? আমি বললাম—আপনারা চলে যান; আমার কোনো বিপদ হবে না। ওনারা চলে গেলেন, সাকিও গেল—আমি একা।
ছাত্ররা আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছি বলবে না; মনে হলো কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন যেমন গুপ্ত জায়গায় থাকে, ও রকম ব্যাপার! তখন রাত একটা বেজে গেছে, আমি প্রচণ্ড টায়ার্ড। শেষে কার্জন হলের একটা বিল্ডিংয়ের তিন বা চারতলার রুমে বসলাম। রুমে ঢুকল নাহিদ, আসিফ, সারজিস, মাহফুজ (মাহফুজ আলম, গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা), নাসীর (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির নেতা)। বিধ্বস্ত কণ্ঠে বললাম, বাবা, তোমরা যা করলে, জাতি তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
তখন সরকার গঠনের প্রসঙ্গটা তারা তুলল। নাহিদ বলল, এক্স্যাক্ট যেমন মনে আছে, স্যার, আমাদের যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে, এই সরকারের প্রধান কে হবেন? আমি সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যার আর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারের (যথাক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ—দুজনেই পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) কথা বললাম। তখন নাহিদ বলল, স্যার, ইউনূস স্যার হলে কেমন হয়?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, উনি তো রাজি হবেন না। ইউনূস স্যার এর আগে আদালতে ছোটাছুটি করতেন, আমি স্যারের সঙ্গে থাকতাম। স্যার বিভিন্ন সময় বলতেন, ওনার জীবনের একমাত্র ব্লান্ডার হচ্ছে পলিটিকসে যাওয়া। সেগুলো মনে রেখে আমি যখন বললাম স্যার রাজি হবেন না, আসিফ সঙ্গে সঙ্গে হেসে দিল। বলল, রাজি হবেন স্যার, আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, মোটামুটি কনফার্ম। আমি চিৎকার করে উঠলাম, বলো কী তোমরা! ওয়ান্ডারফুল! এটা হলে তো এর চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না!
নাহিদ হঠাৎ বলল, স্যার, আমরা কেউ থাকব না সরকারে? আমি বললাম, অবশ্যই, থাকতে চাইলে থাকবে না কেন? দশজনের সরকার হলে অন্তত একজন। আসিফ হেসে বলল, মাত্র টেন পার্সেন্ট! আমি বললাম, তাহলে দুজন থাকো। কেউ একজন চারজনের কথা বলল। বললাম, আমি তো ঠিক করার কেউ না; তোমরা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বোলো।
তারপর বললাম, তোমাদের সঙ্গে আর্মি কথা বলতে চায়। ওরা প্রথমে বলল, স্যার, ওনাদের সঙ্গে কী কথা বলব? আমি বললাম, ওনারা তোমাদের অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়েছেন; বসে দেখো কী বলেন; পছন্দ না হলে এক্সেপ্ট কোরো না। ওরা রুমের বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জানাল, দেখা করবে, বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য পরদিনের একটা সময় দিল। রাত দেড়টার দিকে বাসায় ফিরলাম, যে স্ত্রী আমাকে কেঁদেকেটে বিদায় দিয়েছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো অবশেষে।
৬ আগস্ট: ড. ইউনূস প্রশ্নে টানাপোড়েন
প্রথম আলো: ৬ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধানের সঙ্গে আপনার আলাদা একটা বৈঠকের কথা জানা যায়।
আসিফ নজরুল: সেনা সদরেই, সকালবেলা। তাদের ডাকে গিয়েছিলাম। ওয়াকার ভাই ছাত্রদের ভূমিকার প্রশংসা করলেন, সংস্কারের পক্ষে জোরালোভাবে বললেন। তারপর একদম ফ্র্যাংকলি বললেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবে, এটা নিয়ে কথা বলতে চান। আমি জানালাম, ছাত্রদের সিদ্ধান্ত ইউনূস স্যার হবেন; আমি মনে করি এটাই বেস্ট চয়েস।
উনি দুটো আপত্তির কথা বললেন। এক. ইউনূস স্যার অলরেডি শ্রম আইনের মামলায় কনভিক্টেড। দুই. ওনার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আছে। আমি বোঝালাম, দেখেন, আমি আইনের শিক্ষক। আপনার প্রতি রাগ হলে আপনাকেও রুলিং পার্টি কোনো মামলায় কনভিক্টেড করিয়ে ফেলতে পারবে। বাংলাদেশে এটা করা সম্ভব। এগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রোপাগান্ডা। ড. ইউনূস ন্যাশনালি-ইন্টারন্যাশনালি প্রচণ্ড রেসপেক্টেড মানুষ; ওনার কোনো বিকল্প নেই।
উনি বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। আমি ওনাকে কিছু বর্ণনা দিলাম। ক্লিনটনের (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) সঙ্গে স্যারের সম্পর্ক, জো বাইডেনের (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট) সঙ্গে সম্পর্ক, স্পেনের রানি ওনাকে দেখে কীভাবে দৌড়ে আসেন, জাতিসংঘ কীভাবে ট্রিট করে। এগুলো তো আমার নিজের চোখে দেখা। উনি মন দিয়ে শুনলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, আমাকে কী করতে বলেন? আমি বললাম, গিভ হিম আ কল। উনি বললেন, আমি ওনাকে ফোন দেব? আমি বললাম, কেন দেবেন না? উনি আপনার বাবার সমান বয়সী, একজন নোবেল লরিয়েট। তারপর উনি ওনার দুই বন্ধু এয়ারফোর্স চিফ আর নেভি চিফকে রুমে ডাকলেন। ওনারা দুজনেই বললেন, হ্যাঁ, দাও, সমস্যা কী? তখন উনি বললেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনূস হচ্ছেন। আমার মনে হয়েছিল, ওয়াকার ভাই তখন কনভিন্সড।
কিন্তু আমার ধারণা, এরপর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের বৈঠকের আগের মাঝখানের সময়টায় ওয়াকার ভাইকে কেউ প্রেশারাইজ করেছে, বা ওনার কাছে অন্য কোনো ইনফরমেশন এসেছে। কারণ, বঙ্গভবনের বৈঠকে অন্য রকম একটা ঘটনা ঘটে।
প্রথম আলো: ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের সেই বৈঠকে ছাত্ররা সরাসরি ছিল।
আসিফ নজরুল: মিটিং শুরুর আগে আমরা বসলাম বঙ্গভবনের একটা অভ্যর্থনাকক্ষে। সেখানে সবাই ছিল। নাহিদ, আসিফ, মাহফুজ, নাসীর, হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ; জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, বর্তমানে এনসিপির সংসদ সদস্য), সারজিস, বাকের(আবু বাকের মজুমদার, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা), নুসরাত (নুসরাত তাবাসসুম, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য); অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক) এবং আমি। রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধান এলে হঠাৎ ওয়াকার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আসিফ সাহেব, আপনার সঙ্গে তো কথা হয়েছে; আমরা একটু ছাত্রদের সঙ্গে বসি। ইট কেম অ্যাজ আ সারপ্রাইজ। বোঝা যাচ্ছে, ওনাদের আলাদা বৈঠক করার পরিকল্পনা আছে। ছাত্রদের আমি আগেই সকালের মিটিংয়ের কথা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তোমরা কিন্তু ইউনূস স্যার ছাড়া কারও ব্যাপারে রাজি হবে না। তারা আমার চেয়েও বেশি স্ট্রং এই পজিশনে। তারা বলেছিল, স্যার, এটা নিয়ে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
নাহিদরা মিটিং করতে বের হয়ে গেল। আমরা, অন্যরা বসে আছি তো বসেই আছি অনন্তকাল। মনে হচ্ছিল চার-পাঁচ ঘণ্টা। মিটিং শেষ হলে নাহিদ, আসিফরা এল। আমি বললাম, নাহিদ, তোমরা কি এটা করতে পেরেছ? বলল, জি স্যার, কোনো চিন্তা করবেন না, ইউনূস স্যারই হবেন। আমি ওদের জড়িয়ে ধরলাম। এত খুশি লাগছিল! পরে আমি যে বর্ণনা শুনলাম, পুরো মিটিংয়ের মূল পারপাসই ছিল ইউনূস স্যার বাদে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান হিসেবে নেওয়ার। এমনকি ছাত্রদেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তোমরা কেউ দায়িত্ব নাও। ওরা অনড় ছিল। শেষে ওয়াকার ভাই নাকি বলেছেন, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনারা যেটা ভালো বোঝেন, সেটাই করেন।
পরে রাষ্ট্রপতিসহ ১০-১৫ মিনিটের একটা আনুষ্ঠানিক পর্ব ছিল। ওনারা স্বীকার করলেন যে ওনারা ইউনূস স্যার ছাড়া অন্য কারও কথা বুঝিয়েছেন, কিন্তু ছাত্ররা অনড় ছিল এবং এখন মোটামুটি সবাই একমত, ইউনূস স্যারই হবেন। ওনাদের চেহারা দেখে মনে হলো, রিলাকট্যান্টলি হলেও এটা মেনে নিয়েছেন।
উপদেষ্টাদের তালিকা ও শপথ
প্রথম আলো: উপদেষ্টাদের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াটা বলুন। আপনি তো এর ভেতরেই ছিলেন।
আসিফ নজরুল: ৬ আগস্ট রাতের মিটিংয়ে ছাত্ররা যে ১০-১৫ জনের একটা প্রাথমিক তালিকা দিচ্ছে, এটাই আমি জানতাম না। এই তালিকা তৈরিতে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে আমি পরে যতটা জেনেছি, ছাত্ররা প্রথমে চেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার করতে। বিএনপি এতে রাজি না হওয়ায় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠনের চিন্তাটা আসে। এমন ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথম তালিকা খুব সম্ভবত বিএনপি আর জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হয়।
প্রথম আলো: উপদেষ্টাদের তালিকা নিয়ে আপনার সঙ্গে কখন আলোচনা হয়?
আসিফ নজরুল: ৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে নাহিদরা ফুলার রোডে আমার বাসায় এল। আসিফ-নাহিদ ছিল, মাহফুজ, নাসীর আর সারজিসও ছিল, হাসনাতও হয়তো। তারা বলল, স্যার, উপদেষ্টামণ্ডলীতে কারা কারা থাকতে পারেন? আমি রিজওয়ানার কথা বললাম; বলল, স্যার, এটা অলরেডি আমাদের তালিকায় আছে। সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যারের নাম বললাম; বলল, এটাও আছে। বোঝা গেল, ওরা অলরেডি একটা তালিকা তৈরি করে ফেলেছে। আর্মির পক্ষ থেকে আমাকে একটাই নাম কমিউনিকেট করা হয়েছিল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমানকে যেন বিবেচনা করা হয়। আমি ছাত্রদের বলেছিলাম; তারা হ্যাঁ বা না কিছু বলেনি।
আমার কথায় বোধ হয় একজনকেই নিয়েছিল তারা। ওরা জিজ্ঞেস করল, স্যার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাকে বানানো যায়? আমি তৌহিদ ভাইয়ের (মো. তৌহিদ হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব; পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা) নাম বললাম। ওনাকে আমি চিনতামও না। শুধু লেখা পড়তাম, খুব প্রাজ্ঞ মনে হতো। ওরা সঙ্গে সঙ্গে পাশের রুমে গিয়ে কাকে কাকে যেন ফোন করল। এসে বলল, তৌহিদ ভাই ঠিক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কাকে দেওয়া যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে কাকে দেওয়া যায়—এগুলোও জিজ্ঞেস করেছিল।
আমি পরে শুনেছি, তারা বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, গণতন্ত্র মঞ্চ—এদের সঙ্গে কথা বলে তালিকা ফাইনাল করেছে। সম্ভবত মাহমুদুর রহমানের (সম্পাদক, আমার দেশ) মতো দু-একজন আস্থাভাজন ব্যক্তির সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে। তালিকা ফাইনাল করার ব্যাপারে ড. ইউনূস স্যারের গ্রিন সিগন্যালও ছিল। তবে ফাইনাল তালিকার কারও কারও বিষয়ে আমি আগে জানতাম না। ৮ আগস্ট তারিখে শপথ নিতে গিয়ে দু–একজনকে দেখে বরং একটু অবাক হয়েছি।
প্রথম আলো: অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপদেষ্টাদের তালিকায় নিজে কোনো নাম যুক্ত করেছেন?
আসিফ নজরুল: সেটা আমি জানি না। তবে ৭ আগস্ট রাতে বা ৮ আগস্ট সকালে ইউনূস স্যার আমাকে কয়েকজন নারীর নাম পাঠান। আমি মতামত জানিয়েছিলাম; উনি ওনার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিছুদিন পরে যখন আরও চারজন নতুন উপদেষ্টাকে যুক্ত করা হয়, স্যার আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে সেটা ঠিক করেন। তিনি আরও একজনকে (বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ) নিতে চেয়েছিলেন। আমাকে বললেন ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে। ছাত্ররা আপত্তি করায় নেননি।
প্রথম আলো: ৮ আগস্ট সকালে আপনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। সেখানে কি আর কোনো আলোচনা হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে?
আসিফ নজরুল: বিমানবন্দরে ভিভিআইপি টার্মিনালের ওপর তলায় গিয়ে দেখি বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন, গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেকে। আর ছাত্রদের নিচে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। আমি রেগে গেলাম, তাদের ওপরে নিয়ে এলাম। নাহিদ, আসিফ আর উমামা(উমামা ফাতেমা, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা)। এমন জায়গায় দাঁড় করালাম যাতে স্যার লাউঞ্জে ঢুকেই তাদের দেখেন। স্যার তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, আমাকেও। নিচে গিয়ে একটা রুমে স্যার নাহিদ, আর্মি চিফ এবং আরও দু-একজনকে নিয়ে ঢোকেন। একটু পর স্যার আমাকে ডেকে জানতে চাইলেন, কীভাবে সরকার গঠন করা যায়, সংবিধানে সমস্যা হবে কি না। আমি বললাম, আমরা যদি চাই, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নিয়ে এই সরকার গঠনের সুযোগ আছে। স্যার এটাই করার নির্দেশ দিলেন।
বিমানবন্দরে স্যার নাহিদদের সঙ্গে কথা বলেন। সম্ভবত সেখানে উপদেষ্টাদের চূড়ান্ত তালিকায় স্যারের সম্মতি নেওয়া হয়। পরে স্যার আরেকটা রুমে এসে সমবেত আরও অনেক ছাত্রনেতা, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। স্যারের চারপাশে ফ্যাসিস্ট শাসককে তাড়ানো অকুতোভয় ছাত্রনেতারা। খুব ভালো লাগছিল এই দৃশ্যটা তখন। বিমানবন্দরেই জেনেছি সন্ধ্যার দিকে নতুন সরকারের শপথ হতে পারে।
বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে জানলাম, ইউনূস স্যার আমাকে খুঁজছেন। গুলশানে স্যারের বাসায় মিনিট তিরিশের একটা মিটিং হয়; স্যার পোর্টফোলিওর ব্যাপারে একটা কাগজ দিয়ে আমার মতামত চাইলেন। ওনাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। ওনার সঙ্গে এর আগেরবার দেখা হয়েছিল আদালতে, আসামির জন্য বানানো লোহার খাঁচার ভেতর। আর আজ কিছুক্ষণ পর তিনি দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন! আমার খুব ইমোশনাল লাগল ওনার দিকে তাকিয়ে। কোনো দিন আমি ভাবিনি এমন হতে পারে কখনো!
অন্তর্বর্তী সরকার কেমন ছিল, সামনে কী
প্রথম আলো: আপনি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে ছিলেন। ভেতর থেকে দেখা, এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী, ব্যর্থতা কী?
আসিফ নজরুল: বহু বছর পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, তাদের সত্যিকারের প্রতিনিধিরা সংসদ ও সরকার গঠন করেছে—এটা বড় সাফল্য। কিছু সংস্কার হয়েছে; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত আর আহতদের জন্য কিছু করা গেছে; গুম-খুনের বিচার অবশেষে হচ্ছে; আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এসেছে, জুলাই জাদুঘর ও ডকুমেন্টারির মাধ্যমে ফ্যাসিজমবিরোধী শক্ত বয়ান তৈরি হয়েছে। প্রধানত ইউনূস স্যারের কারণে গণ–অভ্যুত্থানবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রচারণা বন্ধ করা গেছে। আর ব্যর্থতাও রয়েছে। মব নিয়ন্ত্রণ, মামলায় ভুয়া আসামি রাখার সংস্কৃতি, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এ আক্রমণ—এগুলো আমরা অ্যাড্রেস করতে পারিনি। ৩২ নম্বর ভাঙা রোধেও আমাদের ব্যর্থতা ছিল। হামের টিকা নিয়ে আমাদের এরর অব জাজমেন্ট প্রচণ্ড পীড়াদায়ক, যদিও এই সংকট মূলত আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হয়েছিল।
প্রথম আলো: যে ছাত্রনেতৃত্ব অভ্যুত্থানের মুখ ছিল, তাদের রাজনৈতিক দল এনসিপিকে আজ কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আসিফ নজরুল: তারা খারাপ করছে না। সংসদে নাহিদ, আখতার আর হাসনাত খুব ভালো ভূমিকা রাখছে। তাদের দল তৃতীয় ধারার রাজনীতি গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে, একটা আশাবাদ তৈরি করতে পেরেছে। দেখা যাক।
প্রথম আলো: দুই বছর পর সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা কতটা ঠিকানা পেল? আর অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়েও বিভিন্নমুখী আলাপ চলছে। আপনার মূল্যায়ন কী?
আসিফ নজরুল: প্রথম আকাঙ্ক্ষা ছিল হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন, সেটা হয়েছে। ভোটাধিকার এসেছে, গুম বন্ধ হয়েছে, গায়েবি মামলা ও নির্যাতন বন্ধ হয়েছে। ছাত্রদের জন্য পীড়াদায়ক কোটাব্যবস্থা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুমে টর্চার বন্ধ হয়েছে; শ্রমিকদের জন্য ভালো শ্রম আইন হয়েছে। তবে এসব অর্জনকে স্থায়ী করতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও পদক্ষেপ নিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের বাঁধভাঙা প্রত্যাশা থাকে; তা পুরোটা পূরণ হয় না, মানুষ খুব ধৈর্যশীলও থাকতে পারে না। এটা সব জায়গায় হয়।
আর অভ্যুত্থানের বা কোনো কৃতিত্বের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে এটা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে দিয়ে গেছেন। আমরা বোধ হয় তার প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি।
প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘ক্রমেই অস্থিরতা বাড়ছে পুলিশ প্রশাসনে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে পুলিশ প্রশাসনে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট ও তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে স্বস্তি ফিরে আসার কথা থাকলেও এ কারণে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর ভিন্ন পরিস্থিতি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো চলছে বদলি বাণিজ্য। এজন্য একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে। ফলে এ রকম অলিখিত পদায়ন বাণিজ্য নিয়ে পেশাদার পুলিশ সদস্যরা খুবই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ওপর। এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া ‘মব কালচার’ দমনে পুলিশ কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থায় বড় ধরনের আন্দোলন বা শোডাউন হলে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরম বেগ পেতে হবে। বিশেষ করে ওই রকম পরিস্থিতিতে পুলিশের কোনো অংশ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে অবহেলা করে কিংবা তৃতীয় পক্ষের সরকারবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে গোপনে সক্রিয় হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সংকট নিরসনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এজন্য বদলি বাণিজ্য জিরো টলারেন্সে আনাসহ পুলিশ প্রশাসনে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনায় নেওয়া খুবই জরুরি। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই কঠিন কাজটি কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হবে।
আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সবার আগে বদলি বাণিজ্য বন্ধ করতেই হবে। কেউ টাকা দিয়ে পোস্টিং নিতে পারলে তাকে দিয়ে আর যাই কিছু হোক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণও সম্ভব না। কোনো ওসিকে যদি ৫০ লাখ টাকা ঘুস দিয়ে পোস্টিং নিতে হয়, তাহলে তিনি তো আগে এসে ওই টাকা তুলবেন। ফলে থানার আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা, তার কাছে প্রধান বিষয় হবে না।
পুলিশ বাহিনীতে চলমান অস্থিরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন অতিরিক্ত আইজিপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, পদোন্নতি-পদায়নে ফিট লিস্ট (উপযুক্ত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা) অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি এবং থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদের মতো সংবেদনশীল স্থানগুলোতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদায়ন হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ এখন অনেকটা প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ (বিশেষ করে ইউনিট প্রধান) পদগুলো অর্থ ও তদবিরের বিনিময়ে বণ্টন করা হচ্ছে বলেও গুঞ্জন জোরালো হয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশের একজন ডিআইজি যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সুপারদের (এসপি) জন্য ৬৪টি জেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে প্রায় ১০০টি। অথচ এসপির সংখ্যা ৭০০-এর বেশি। নিয়মানুযায়ী ব্যাচভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ফিট লিস্ট তৈরি করে পদায়ন করার কথা থাকলেও, সেটি করা হচ্ছে না। ফলে শুধু নানামুখী তদবিরের জোরে নিচের দিকে থাকা অযোগ্য বা তোষামোদকারী অফিসাররাও গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পেয়ে যাচ্ছে। আবার এ ধরনের বিতর্কিত কোনো পোস্টিং নিয়ে যখন কিছু প্রমাণসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি হয় তখন দ্রুত তাকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে এসব ঘটনা পুরো বাহিনীতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের মনে যে ক্ষোভ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও অনেকের মধ্যে একই ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক ঘরানার ট্যাগ লাগিয়ে ইতঃপূর্বে যাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, এখন আবার তাদের প্রাপ্য পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে নানা বাধা ও বাণিজ্য শুরু হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে কয়েকজন ভালো অফিসারকেও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দিয়ে জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠনোর মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এমন কয়েকজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, পেশাগত জীবনে তাদের সাফল্য ও সততা সর্বজনবিদিত ছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট বা বড় ধরনের অভিযোগ ছাড়া এভাবে একের পর এক জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর কারণে পুলিশের বিভিন্ন স্তরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্পৃহা ও পেশাদারত্ব মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালার (পিআরবি) ইচ্ছামতো সংশোধন। নতুন চার হাজার এএসআই পদ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ বিভাগীয় প্রমোশন ও ৫০ ভাগ সরাসরি নিয়োগের নিয়ম মানা হলেও, সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ পদদলিত করা হয়েছে। পিআরবি সংশোধন করে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে যোগ্যতার ভিত্তিতে এএসআই থেকে এসআই হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, যা মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
কালের কণ্ঠ
‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়।
এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা হতাহত হয়েছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।’
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলানগরে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংস্কৃতিসচিব কানিজ মাওলা বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রায়ই একটি কথা বলি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের আর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভোলেনি একইভাবে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় শহীদদেরও ভুলবে না।’ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সহযোগী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
লাল টেলিফোনে হাসিনার কল রেকর্ড শুনলেন প্রধানমন্ত্রী : ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের পর জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় তিনি জাদুঘরে সংরক্ষিত একটি লাল টেলিফোনে রেকর্ড করা শেখ হাসিনার কলের অডিও শোনেন। পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। তিনি জাদুঘরের সংরক্ষিত নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মারকগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গণভবনে তৈরি করা হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। গতকাল উদ্বোধনের দিন জাদুঘরটি শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য খোলা ছিল। আজ বৃহস্পতিবার থেকে সবার জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত থাকবে।
শহীদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সড়কের নামকরণ করা হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত জুলাই যোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা করানো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে তাঁদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সহায়তা করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার আন্তরিক।’
জুলাই সনদও বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ও কাজ শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভরসমৃদ্ধ নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি এই অনুষ্ঠানে একটি বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা শুরু করেছে। এসব পরিস্থিতি তৈরি করে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন আমাদের।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্য। এই বাংলাদেশ আর কখনোই তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না ইনশাল্লাহ।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘আধিপত্যের লড়াইয়ে ছাত্রদল-শিবির’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ফের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। আবাসিক সুবিধা রয়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে সংঘর্ষগুলো ঘটে বলে দুদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আলাপে জানা গেছে। গতকাল বুধবারও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম সরকারি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
এর আগে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সংঘর্ষে জড়ায় সংগঠন দুটি। ঢাকার বাইরে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজেও দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সংঘর্ষের পর মাদ্রাসার হল বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়।
জানা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর ছয় মাস হতে চললেও ক্যাম্পাসের হলগুলোতে এখনও আশানুরূপ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি ছাত্রদল। এখনও নামে-বেনামে সমান শক্তিতে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে রেখেছে শিবির। বিশেষত হলগুলোতে শিবির বেশ সক্রিয়। এটা নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
অন্যদিকে যেসব ক্যাম্পাসে শিবির শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, সেগুলোতে তারা অন্যদের জায়গা দিতে রাজি নয়। এই নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। যদিও সরাসরি ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি স্বীকার করেন না। অন্যদিকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়া ছাত্রদল নিজেদের অবস্থান তৈরিতে কঠোর অবস্থানে।
গতকাল বুধবার জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, গণহত্যার বিচার এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজমায়েত করেছে ছাত্রশিবির। এ সময় শহীদ মিনার ও রাজু ভাস্কর্যে নেতাকর্মীরা মহড়া দেন। পরে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করেন তারা।
মিছিলে বেশ শক্ত অবস্থানের কথা জানান ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছাত্রশিবির এক ধাওয়া দিলে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যান আপনারা। ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের লাগাম না ধরলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলব। তখন ক্যাম্পাসে ১০ মিনিটও দাঁড়াতে পারবেন না। বারবার আমরা সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছি। সহনশীলতা মানে দুর্বলতা নয়।
সমাবেশে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রদলের মনে অনেক কষ্ট, ১৭ বছর না খেয়ে ক্ষমতায় আসার পর গত পাঁচ মাসে ছাত্রশিবিরের কারণে এখনও না খেয়ে আছে। এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচবার হল দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, জগন্নাথ হলে ব্যর্থ হয়েছে। আমি একটি ঘোষণা দিতে চাই, বাংলাদেশের কোনো ক্যাম্পাস দখল করতে হলে ছাত্রশিবিরের রক্তের ওপর দিয়ে যেতে হবে।
প্রতিক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ছাত্রশিবির সভাপতির এ ধরনের বক্তব্য শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার প্রকাশ্য উস্কানি। ১০ মিনিট নয়, ১০ বছরও নয়, আপনার মতো আরও ১০-২০ জন সভাপতির মেয়াদ পূর্ণ করেও কিছুই করতে পারবেন না। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, হুমকি কিংবা উস্কানির মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে কোনো অপচেষ্টা শিক্ষার্থীরাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত ২০
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল বুধবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। শিবিরের র্যালিতে বহিরাগত থাকার অভিযোগে ছাত্রদল বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ‘অদম্য জুলাই’ নামে সকালে ক্যাম্পাসে র্যালি বের করে ছাত্রশিবির। প্রশাসনিক ভবন চত্বর থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে পৌঁছলে ছাত্রদলের হামলায় র্যালি পণ্ড হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা র্যালিতে বহিরাগত আছে দাবি করে তা আটকে দেন। বহিরাগতদের বের করে র্যালি করতে বললে শিবির তাতে অস্বীকৃতি জানায়। কয়েকজন বহিরাগতকে চিহ্নিত করে ছাত্রদল কর্মীরা র্যালি থেকে বের করে দিতে চাইলে দুপক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। ধাওয়া দিয়ে শিবির কর্মীদের ক্যাম্পাসের বাইরে বের করে দেওয়া হলে তারা ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। ছাত্রদল আবারও ধাওয়া দিয়ে মহাসড়ক দখলে নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সস্পাদক জাকারিয়া ইসলাম বলেন, তাদের মিছিলে কোনো বহিরাগত ছিল না। ছাত্রদল বহিরাগত পুশিং করে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবির সভাপতি মনিরুল ইসলাম, আল-আমিন, হাফিজুর রহমান, শাহিনসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, শিবির ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার জন্য বহিরাগত দিয়ে মিছিল করতে চেয়েছিল। ছাত্রদল তাদের প্রতিরোধ করে বের করে দিয়েছে। শিবিরের হামলায় ছাত্রদলের ১০ জন আহত হয়েছে।
প্রক্টর মেহেদী হাসান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে সর্বমোট ২০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব নিয়ে পরে কথা বলবেন।
ইত্তেফাক
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ঐক্য, বিচার ও সংস্কারের প্রত্যয়’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেদিন ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। সেই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলো গতকাল বুধবার। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের আমলে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। রাজধানীসহ সারা দেশে, এমনকি বিদেশেও বিভিন্ন স্থানে সব আয়োজনেই অভিন্ন কণ্ঠে ঐক্য ধরে রেখে জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্নের ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জুলাইয়ের অংশীজনেরা।
সবার বক্তব্য, বিবৃতি, নিবন্ধ, কবিতা ও গ্রাফিতিতে নতুন করে উঠে এসেছে জুলাইয়ের দায়-দেনার বিষয়। বিশ্লেষণ চলছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষায় বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে সরকার ও বিরোধী দলসহ জুলাইয়ের সব অংশীজনের মুখে। উঠে এসেছে জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, শহিদ ও আহতদের ত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, আইনি সুরক্ষা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক দায়িত্বের কথা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে গতকাল উদ্বোধন হয়েছে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে সঙ্গে করে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদও জুলাইয়ের শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। ‘নতুন যাত্রার’ এই সময়ে মতের ভিন্নতা থাকবেই। তবে, জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। কোনো বিভাজন, বিদ্বেষ বা সংকীর্ণ স্বার্থ যেন জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ—যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন শেষে সেখানে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও উঠে এসেছে জুলাই হত্যকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা। তিনি বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহিদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শহিদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ব, ইনশাআল্লাহ।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল গতকাল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আজ আমাদের আরেক বিজয় দিবস! একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন আজ। এই দিনটি হঠাৎ করে আসেনি। জুলাই অসন্তোষ শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়নি। কিন্তু ২৫ মার্চের কালরাতের পর যেমন মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তেমনি ১৬ জুলাইয়ের পর নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড শেখ হাসিনার পতনকেও অনিবার্য করে তোলে। নিজের দেশের মানুষের ন্যায্য প্রতিবাদের জবাবে এমন নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের নজির দক্ষিণ এশিয়ায় কোথাও পাওয়া যাবে না। ৫ আগস্টের পর সদলবলে হাসিনার এক্সোডাস বা পালানোর নজিরও আধুনিক বিশ্বে নেই।’
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ ব্যাংক খাত’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য এখনো গভীর সঙ্কটে রয়েছে। একদিকে আমানত প্রবৃদ্ধি ও উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে খেলাপি ঋণ, অব্যাহত রয়েছে মূলধনের ঘাটতি এবং কমছে ব্যাংকগুলোর মুনাফা। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান থাকলেও উৎপাদন ও বিনিয়োগে তার কাক্সিক্ষত প্রভাব পড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকে ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের হার ৩২.২৬ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের প্রতি তিন টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় এক টাকা এখন খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একই সাথে নিট খেলাপি ঋণের হারও ১৩.৯৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.০১ শতাংশে উঠেছে। এর অর্থ হলো, সংরক্ষিত প্রভিশন ও সুদ স্থগিত রাখার পরও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
২ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি
খেলাপি ঋণ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে প্রভিশনের চাপও। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল চার লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। বিপরীতে সংরক্ষিত হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। বিদেশী ব্যাংকগুলো সামান্য উদ্বৃত্ত প্রভিশন ধরে রাখতে সক্ষম হলেও পুরো খাতের চিত্র উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের মূলধন আরো ক্ষয় হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মূলধন সঙ্কট এখনো কাটেনি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত (সিআরএআর) সামান্য উন্নতি হলেও তা এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে অনেক নিচে। ২০২৬ সালের জুন শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের সিআরএআর ছিল ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশ, যেখানে বেসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় মূলধনের তুলনায় ব্যাংকিং খাতে এখনো বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। পাঁচটি একীভূত দুর্বল ইসলামী ব্যাংক-এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক-অন্তর্ভুক্ত করলে এই খাতের সিআরএআর নেমে আসে ঋণাত্মক ৪৩.১৮ শতাংশে। তবে এই পাঁচ ব্যাংক বাদ দিলে অন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোর মূলধন অনুপাত ৭.৭০ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। অন্যদিকে প্রচলিত ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সিআরএআর বেড়ে ১০.৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মান অতিক্রম করেছে। এতে বোঝা যায়, মূলধন সঙ্কট পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই; বরং দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকেই সঙ্কট বেশি কেন্দ্রীভূত।
মুনাফায় বড় ধস
ব্যাংকগুলোর আয়-ব্যয়ের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। সম্পদের ওপর মুনাফার হার (আরওআর) ঋণাত্মক ০.৫৪ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের ওপর মুনাফার হার (আওই) ঋণাত্মক ১৫.১০ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন (এনআইএম) সামান্য কমে ১.৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করায় ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বণিক বার্তা
‘শুধু আওয়ামী লীগ নয়, দায় আছে অন্তর্বর্তী সরকারেরও’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিল করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে বিদ্যুৎ খাতে এ আইনের আওতাধীন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্প বাতিল হয়।
একই কারণে বাতিল হয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সরবরাহ চুক্তিও। দেশের জ্বালানি অনিশ্চয়তার পেছনে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাটের বড় দায় রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বলে যেসব হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেগুলোও জ্বালানি খাতকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়ার জন্য কম দায়ী নয় বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ৩১টি প্রকল্প থেকে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলতি বছর উৎপাদনে আসার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়া এলএনজির তৃতীয় ভাসমান টার্মিনালটিও চলতি বছরের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশে চলমান গ্যাস সংকট অনেকটাই সামাল দেয়া যেত। একই সঙ্গে লোডশেডিং মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য খাত বড় সহায়তা দিতে পারত বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিভিন্ন খাত সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত দেড় দশকের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। আইন-সংবিধান সংস্কার, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির মতো ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বিপুল গুরুত্বারোপ করলেও জ্বালানির মতো অত্যাবশ্যকীয় খাত অগ্রাধিকার পায়নি। অন্যদিকে সেই সময়ে জ্বালানি খাত সংস্কারে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকেও অন্তর্বর্তী সরকারকে কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়া হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। তাদের মতে, পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হলে যে দেশের জ্বালানি খাতের বড় সংকট সামাল দিতে হবে এমন ভাবনা বা এ বিষয়ে পূর্বপরিকল্পনার অভাব ছিল বিএনপির।
দেশে বর্তমানে গ্যাস সংকট চলছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি টার্মিনাল ত্রুটিতে পড়ায় সংকট আরো প্রকট হয়েছে। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও সিএনজি খাতে গ্যাসের সংকট গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলেছে। জ্বালানি খাতের এ সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা গ্যাস সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে। একই সঙ্গে এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানির উচ্চ ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পড়ে ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গ্যাসের চাহিদা ও জোগানে বর্তমানে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সংকট রয়েছে (স্বাভাবিক সময়ে)। এ ঘাটতি মোকাবেলায় পতিত আওয়ামী লীগের সময়ে দেশে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে শুরুতেই দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন বাতিল করে। যার মাধ্যমে এ খাতের চলমান চুক্তি বাতিল করে দেয় সরকার। এসব চুক্তির একটি ছিল ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল।
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের এই এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল করা হয়। ভাসমান এই এলএনজি টার্মিনালটি চলতি বছরের অক্টোবরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা ছিল। এ চুক্তির পাশাপাশি পেট্রোবাংলার সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি ছিল, যা চলতি বছরের জুন থেকে আমদানি হওয়ার কথা ছিল। এলএনজি আমদানি বিষয়ে এ চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি বাতিল করা না হলে শিগগিরই এলএনজি টার্মিনালটি উৎপাদনে চলে আসত। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘ছাত্ররাজনীতি: শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতায় সেই লেজুড়বৃত্তি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ৯ দফার অন্যতম ছিল ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ করা। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। দুই বছর এসে ছাত্রসংগঠনগুলোর আক্ষেপ, সেই দাবি এখনো পূরণ হয়নি। সংগঠনগুলো বলছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে চলমান অস্থিরতার কারণ লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার সপ্তম দফা হিসেবে থাকা এই দাবি পূরণ না হওয়ার জন্য পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে ছাত্রসংগঠনগুলো। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বলেছে, তারা ওই দাবি ওই সময়েই প্রত্যাখ্যান করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিলেন, তাঁরাই এখন লেজুড়বৃত্তিতে জড়াচ্ছেন। ছাত্র-সংগঠনগুলো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়নে যতটা তৎপর, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ততটা সোচ্চার নয়।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও এমনটাই মনে করেন। তিনি বলেছেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানপূর্ববর্তী সময়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনই সক্রিয় রয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক দলও ছাত্রসংগঠন করেছে। আবার যারা নিজেদের স্বতন্ত্র ছাত্রসংগঠন বলে দাবি করে, তাদেরও রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে। অতীতের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলো সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। হঠাৎ করে অন্তত সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ও নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। গতকাল বিভিন্ন জেলায়ও এ তিন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির চর্চার কারণেই ক্যাম্পাসগুলো বরাবরের মতো আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে যে তিন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ হয়েছে, তার মধ্যে ছাত্রদল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন। ছাত্রশিবির জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন। এই দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। ওই ৯ দফার সপ্তম দাবি ছিল—ঢাবি, জাবি, চবি, রাবিসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনসহ দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদকে কার্যকর করতে হবে। প্রায় দুই বছর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে ছাত্ররাজনীতি মুক্ত হতে পারেনি বলে মনে করেন ছাত্রনেতারাই।
লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ওই দাবি তুলে ধরা আব্দুল কাদের এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ওই ৯ দফার সপ্তম দাবির উদ্দেশ্য শুধু লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা ছিল না, বরং শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা (পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট) তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
এই দাবির সঙ্গে ওই সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একমত ছিল না বলে জানিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। তিনি বলেন, ‘ছাত্রশিবির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের গুপ্ত রাজনীতি চালিয়ে যেতে প্রতারণামূলকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি সামনে এনেছিল। আমরা সে সময়ই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। অথচ পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, তারাই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের জন্য তাঁরা ভোট চাইতে গেছেন। দলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেই ৯ দফা লিখে দেওয়া হয়েছিল। সপ্তম দফায় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বলতে আমরা কী বোঝাতে চেয়েছিলাম, তা বারবার স্পষ্ট করেছি।’ তিনি বলেন, ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন কাজ করতে পারছিল না। জোরপূর্বক ছাত্রদের আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে নেওয়া হতো। না গেলে নির্যাতন করা হতো। ওই প্রেক্ষাপটে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছিল।
দেশ রূপান্তর
‘অপরাধের ধরন বদলেছে, নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটেনি’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যাপক মানবাধিকার-লঙ্ঘনের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বতন পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি; উল্টো মব বা ‘গণ-সহিংসতা’ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের আশা তৈরি হয়।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ নিয়মিতই ঘটছে। অপরাধ, দুর্বৃত্তপনা ও সহিংসতা চলমান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মব-সহিংসতা ও বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে সংঘটিত অপরাধ-সংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারের বদলে অপরাধের ধরনে কিছু বদল ঘটলেও জননিরাপত্তা-বিষয়ক উদ্বেগ কাটেনি; ভয়ে থাকতে হচ্ছে সবাইকে। ছিনতাই ব্যাপক হারে বেড়েছে। চাঁদাবাজি চলছেই। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বেড়েছে অপরাধ। তুচ্ছ ঘটনায় বড় সহিংসতা হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলছে দখলের রাজত্ব। এ নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ছে রেষারেষিতে। নিয়ন্ত্রণহীন কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা বেপরোয়া। অনেক বেশি অরক্ষিত নারী ও শিশু। গত ছয় মাসে পাঁচ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে পিছিয়ে ছিল না। তাদের দেড় বছরে প্রায় বিশ হাজার নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে; অন্যান্য অপরাধ থেকেও মানুষের নিস্তার ছিল না।
অপরাধ-বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব-সহিংসতা তুঙ্গে থাকলেও বর্তমানে চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক আধিপত্যকেন্দ্রিক সংঘর্ষ ও হত্যাকা- বেড়েছে। নির্বাচিত সরকার আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির উন্নতির আশা পূরণ করতে পারছে না। তাদের মতে, জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে সরকারকে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকরী সংস্কার করতে হবে। সরকারকে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর গভীরতা আন্তরিকভাবে স্বীকার করে মোকাবিলার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বেপরোয়া মব: পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা কমলেও মব-সন্ত্রাস নিয়মিত ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কমে যাওয়ায় জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ায় রাস্তাঘাটে, প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে মব-সহিংসতা আশঙ্কাজনক বেড়েছিল। মানবাধিকার সহায়তা সমিতির (এইচআরএসএস) তথ্যানুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ৪১৩টি মব-সহিংসতায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির খোঁজে প্রধানমন্ত্রী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নে শুধু দলীয় পরিসরেই নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনেও গ্রহণযোগ্য এমন কাউকে খুঁজছেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে এককভাবে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি হাইকমান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, বিগত সময়ে বিএনপির মনোনীত তিনজন রাষ্ট্রপতির বিষয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেই এ পদে মনোনয়ন দেবেন তারেক রহমান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপরে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর আস্থা রয়েছে। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজনকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি বেছে নেবে; যিনি একই সঙ্গে হবেন দক্ষ, বিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি যার রয়েছে অঘাত আনুগত্য। বিএনপির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি সর্বোপরি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে দলটি। তাড়াহুড়া না করে ভেবেচিন্তে সময় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের এখতিয়ার বিএনপি চেয়ারম্যানের থাকলেও স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতাদের একান্তে পরামর্শ করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন কে পাচ্ছেন ইতোমধ্যে তা ঠিক করেছেন তারেক রহমান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে- দেশ ও দলের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস; দক্ষতা ও প্রজ্ঞা। তারা বলছেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতায় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। কিন্তু বিএনপির প্রতি তাঁর আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ব্যর্থ হন বলে অনেকে মনে করেন। ফলে দেশে এক-এগারোর জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে তিনি বাধ্য হন। এরপর রাষ্ট্রপতি হিসাবেও তিনি সাহসী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। সার্বিকভাবে এর ফলাফল পুরোপুরি বিএনপির বিপক্ষে গেছে বলে মনে করেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে, বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলের প্রতি আনুগত্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে অতীতের সব ঘটনা বিশ্লেষণ করেই এবার রাষ্ট্রপতি পদে একজনকে বসাতে চায় বিএনপি। তাছাড়া এ প্রশ্নে যতটা সম্ভব বিতর্কও এড়াতে চায় দলটি।
গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা। অবশ্য সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর পরেই আলোচনায় রয়েছেন দলের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি। তৃতীয় নামটি হচ্ছে সাবেক মন্ত্রী ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এমপি। এ ছাড়াও গুঞ্জন আছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের নাম। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এবার আর আমলা কিংবা অরাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবে না বিএনপি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির নাম বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। আলোচনায় আছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইঊনূস ও খ্যাতিমান মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খানের নাম।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। জানা যায়, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের সদস্যরাই এ নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে ভোট দেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা দল বা জোটের মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি থাকে। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাষ্ট্রপতি পদ সাংবিধানিকভাবে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র না হলেও রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হিসেবে এর রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব অনেক। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
