ইতিহাস যখন লেখা হয়, তখন আলোটা সাধারণত রাজপথের ওপরই পড়ে। ব্যারিকেড, মিছিল, স্লোগান, রক্ত, পতন এসবই ইতিহাসের দৃশ্যমান অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি অদৃশ্য পৃষ্ঠা থাকে, যেখানে বন্দুকের শব্দ নেই, আছে ব্যাংকের লেনদেন; রাজপথের ব্যারিকেড নেই, আছে হাজার মাইল দূরে বসে একজন প্রবাসীর কঠিন সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন থেকে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসও তেমনই এক অসম্পূর্ণ কাহিনি, যদি সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা না লেখা হয়।
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে দেশের ভেতরে শিক্ষার্থীরা জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলেন। আর দেশের বাইরে লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, রিয়াদ, রোম কিংবা কুয়ালালামপুরে হাজারো বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের দরজায়, বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সামনে এবং নিজেদের কমিউনিটির ভেতরে এক ধরনের নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
এটি শুধু রাজনৈতিক সংহতি ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। তারা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ কেবল ভূগোলের নাম নয়, এটি স্মৃতি, আত্মীয়তা এবং দায়বদ্ধতারও নাম।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, ব্যাংকিং খাত সবকিছুর সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক। তাই যখন প্রবাসীদের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে সীমিত সময়ের জন্য রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানায়, সেটি নিছক একটি অনলাইন প্রচারণা ছিল না; অর্থনীতির ভাষায় সেটি ছিল প্রতীকী চাপ সৃষ্টির একটি প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ১.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। তবে এই পতনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিই কাজ করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মৌসুমি প্রবণতা, ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার, হুন্ডি, বৈশ্বিক শ্রমবাজার সবকিছুই রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব ফেলে।
কিন্তু আরেকটি সত্যও অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তারা শুধু অর্থ পাঠান না; প্রয়োজনে অর্থনীতির ভাষায়ও রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারেন।
এখানেই জুলাই আন্দোলনের একটি নতুন অভিঘাত তৈরি হয়। প্রবাসীরা আর কেবল 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' নন; তারা হয়ে ওঠেন জনমত নির্মাতা।
গত দেড় দশকে অসংখ্য সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, ইউটিউবার এবং রাজনৈতিক কর্মী দেশ ছেড়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। দেশে যখন সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছিল, তখন প্রবাসভিত্তিক অনেক প্ল্যাটফর্ম বিকল্প তথ্যপ্রবাহের জায়গা তৈরি করে। কেউ লাইভ সম্প্রচার করেছেন, কেউ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন, কেউ তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
অবশ্য এই ছবির আরেকটি দিকও আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন তথ্যের দরজা খুলে দেয়, তেমনি গুজবেরও। জুলাই আন্দোলনের সময় যেমন অসংখ্য নির্ভুল তথ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে, তেমনি অনেক যাচাইহীন দাবিও ভাইরাল হয়েছে। ফলে ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হলে সাহসের পাশাপাশি সত্যের প্রতিও সমান অনুগত থাকতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক আন্তর্জাতিক অধ্যায়গুলোর একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে রচিত হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ করার অভিযোগে ৫৭ বাংলাদেশিকে দণ্ডিত করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তাদের ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এই ৫৭ জনের গল্প শুধু কয়েকজন মানুষের নয়। এটি সেই প্রবাসীদের প্রতীক, যারা নিজের দেশের জন্য কথা বলতে গিয়ে বিদেশের মাটিতেও মূল্য চুকিয়েছেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতির একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আগস্ট থেকেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ আবার বাড়তে থাকে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী থাকে। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা, বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তন, হুন্ডি দমনের উদ্যোগ এবং নতুন অর্থনৈতিক প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে এই প্রবৃদ্ধি তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন। অর্থাৎ এটিকে কোনো একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তবে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। যারা সংকটের সময় রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে?
প্রবাসীরা আজও বিমানবন্দরে হয়রানির অভিযোগ করেন। বিদেশে শ্রমবাজারে প্রতারণার শিকার হন। দূতাবাসের সেবায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের রিজার্ভ সমৃদ্ধ হয়, অথচ নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রবাসীদের প্রয়োজন পড়ে যখন ডলার দরকার হয়; কিন্তু জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে তাদের কতটা দেখা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো রাষ্ট্রের কাছে ঋণ হয়ে আছে।
জুলাই আন্দোলন আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। আধুনিক পৃথিবীতে ভৌগোলিক দূরত্ব রাজনৈতিক দূরত্ব নয়। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার যুগে লন্ডনের একজন বাংলাদেশি কিংবা দুবাইয়ের একজন শ্রমিকও ঢাকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারেন। রাষ্ট্র চাইলে এই শক্তিকে উন্নয়নের সম্পদে পরিণত করতে পারে; না চাইলে এটি পরিণত হতে পারে অসন্তোষের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে।
ইতিহাসের নির্মম নিয়ম হলো, ক্ষমতা সব সময় দৃশ্যমান শক্তিকেই মনে রাখে। কিন্তু সময় শেষ পর্যন্ত স্মরণ করে নীরব শক্তিকে।
জুলাইয়ের রাস্তায় যারা রক্ত দিয়েছেন, তারা ইতিহাসের অমর নায়ক। কিন্তু সেই ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আরও একদল মানুষ ছিলেন, যারা হয়তো কোনো ব্যারিকেডে ছিলেন না, কিন্তু নিজের উপার্জনের ওপর, নিজের নিরাপত্তার ওপর, নিজের ভবিষ্যতের ওপর ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তারা ছিলেন প্রবাসী। তারা ছিলেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই নতুন করে লেখা হয়, তাহলে সেই ইতিহাসে শুধু রাজপথের বীরদের নয়, প্রবাসের নীরব যোদ্ধাদেরও সমান মর্যাদায় স্থান দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের পতাকা শুধু সীমান্তের ভেতরে ওড়ে না; সেটি ওড়ে পৃথিবীর প্রতিটি শহরে, যেখানে একজন বাংলাদেশি নিজের শ্রম, ঘাম এবং ভালোবাসা দিয়ে প্রতিদিন দেশের নামটিকে বাঁচিয়ে রাখেন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
