বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ভৌগোলিক পরিচয় বহন করে না; তারা একটি জাতির রাজনৈতিক বিবেকের প্রতীক হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই বিরল প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এটি শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের নির্মাণশালা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের পদচারণা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রতিটি বাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই কারণেই ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উচ্চারিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আলোচনা যদি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ হতে চায়, তাহলে প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমরা যখন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” বলি, তখন আসলে কাকে বুঝি? প্রশাসনকে, নাকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে? প্রতিষ্ঠানকে, নাকি একটি বৌদ্ধিক সমাজকে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে আমাদের মূল্যায়নের সততা।
বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকেই পুরো প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এটি যেমন বিশ্লেষণগত ভুল, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অজ্ঞতারও পরিচয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই একটি কণ্ঠের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বহুস্বরের সমাজ। এখানে মতের ভিন্নতা দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। সেই শক্তিই বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের থেকে আলাদা করে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। অনেকেই মনে করেছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে প্রশাসনের আরও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল। আবার অন্যরা বলেছেন, প্রশাসনের সামনে আইনগত, সাংগঠনিক এবং নিরাপত্তাগত সীমাবদ্ধতা ছিল। এই বিতর্কের চূড়ান্ত রায় ইতিহাস একদিন নথি, সাক্ষ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে দেবে। আজকের আবেগ সেই রায়ের বিকল্প হতে পারে না।
কিন্তু প্রশাসনের অবস্থান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচার করা মানে একটি বিশাল বটবৃক্ষকে তার একটি ডাল দিয়ে মূল্যায়ন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি প্রশাসনিক ভবনে নয়; তার মানুষের মধ্যে। আর জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে সেই মানবিক ও নৈতিক শক্তির নানা প্রকাশ আমরা দেখেছি।
অনেক শিক্ষক নাগরিক হিসেবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে মত দিয়েছেন, কেউ আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কেউ আইনি বা মানবিক সহায়তা দিয়েছেন। আবার কেউ সচেতনভাবে নীরব থেকেছেন, কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক মূল্যায়ন করেছেন। এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং এটিই একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষকের পরিচয়কে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। একজন শিক্ষক রাষ্ট্রের কর্মচারী হতে পারেন, কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের মুখপাত্র নন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হতে পারেন, কিন্তু প্রতিটি ব্যক্তিগত মত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত অবস্থান নয়। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন স্বাধীন চিন্তাশীল নাগরিক। তাঁর পেশাগত দায়িত্ব জ্ঞান সৃষ্টি করা; আর নাগরিক দায়িত্ব সত্য, ন্যায় ও যুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি মূলত জন্ম নিয়েছে স্বাধীন চিন্তার ওপর। জার্মান দার্শনিক উইলহেল্ম ফন হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র অর্থায়ন করতে পারে, কিন্তু চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ব্রিটিশ চিন্তাবিদ জন হেনরি নিউম্যান বিশ্ববিদ্যালয়কে বলেছিলেন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার বিদ্যালয়’। এই দর্শন আজও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার ভিত্তি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আদর্শ সবসময় বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রশাসনিক চাপ এবং দলীয় প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পরিবেশকে সংকুচিত করেছে। তবুও প্রতিটি প্রজন্মে কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাঁদের ব্যক্তিগত সততা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ।
তবে এখানে একটি সতর্কতা অপরিহার্য। কোনো আন্দোলনের সমর্থক বা বিরোধী হওয়া এক বিষয়; আর ইতিহাস লেখা আরেক বিষয়। ইতিহাস কখনো একপক্ষের ভাষ্য নয়। একটি দায়িত্বশীল সমাজকে ঘটনাপ্রবাহের সব দিক রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, আন্দোলনকারীদের ভূমিকা, প্রশাসনের আচরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং স্বাধীন তদন্তের ফল সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হয়। তা না হলে ইতিহাস গবেষণা নয়, রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত হয়।
এই কারণেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর আলাদা রাখা জরুরি- রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের দায় রাষ্ট্রের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় প্রশাসনের। আর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নৈতিক অবস্থানের দায় তাঁদের ব্যক্তিগত। এই তিনটিকে একাকার করে দিলে সত্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।
জুলাই আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার মর্যাদা ধরে রাখে কেবল পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষার মাধ্যমে নয়; বরং প্রশ্ন করার অধিকার রক্ষা করে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করা যায় না, সেখানে গবেষণা বিকশিত হয় না। যেখানে গবেষণা বিকশিত হয় না, সেখানে স্বাধীন চিন্তা জন্মায় না। আর স্বাধীন চিন্তা ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবনী, গণতান্ত্রিক বা আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না।
আজকের বাংলাদেশে তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবারও এমন একটি মুক্ত বৌদ্ধিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যুক্তির শক্তি হবে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড। যেখানে শিক্ষক কোনো ভয় ছাড়াই গবেষণা করতে পারবেন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারবে, আর প্রশাসন হবে মতের প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষ রক্ষক, কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নয়।
একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজের প্রতিও প্রত্যাশা কম নয়। নাগরিক হিসেবে তাঁদের অধিকার যেমন আছে, তেমনি আছে দায়িত্বও। আবেগের মুহূর্তে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলা; দলীয় আনুগত্যের আগে নৈতিক সততা রক্ষা করা; জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এসবই একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রকৃত শক্তি। কারণ শিক্ষকের প্রতিটি উচ্চারিত বাক্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার জগতে প্রতিধ্বনিত হয়।
সবশেষে একটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভবনের নীরবতা নয়, মানুষের সাহসকে মনে রাখে। প্রশাসনিক আদেশ সময়ের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়; কিন্তু নৈতিক অবস্থান ইতিহাসের দীর্ঘ স্মৃতিতে রয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের উত্তরাধিকারও তাই কেবল তার প্রশাসনিক রেকর্ডে নয়, বরং সেইসব শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মীদের সাহসে, যারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের বিবেকের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণা আরও হবে, বিতর্কও চলবে। নতুন দলিল আসবে, নতুন ব্যাখ্যাও তৈরি হবে। কিন্তু একটি সত্য সম্ভবত অপরিবর্তিত থাকবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়, তার বৌদ্ধিক স্বাধীনতায়; তার ভবনে নয়, তার মানুষের বিবেকে। আর যে জাতি এই পার্থক্য বুঝতে শেখে, সেই জাতিই ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হয়।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি, ইমেইল: [email protected]
