দিল্লিতে এক ব্যক্তি ৩৯ বছর ধরে এমন একটি হৃদপিণ্ড নিয়ে বেঁচে ছিলেন, যা শুধু বুকের ডান পাশে ছিল না, জন্মগতভাবেই তার গঠনও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি জানতেনই না যে তার হৃদপিণ্ডের একটি অংশ এমন একটি কাজ করছে, যা করার জন্য সেটি প্রকৃতিগতভাবে তৈরি হয়নি। ফুসফুসে রক্ত পাঠানোর বদলে সেটিকে পুরো শরীরে রক্ত পাম্প করতে হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের এই অতিরিক্ত চাপ হৃদপিণ্ডকে দুর্বল করে দেয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে। গত মাসে দিল্লির ভিএমএমসি অ্যান্ড সফদরজং হাসপাতালের চিকিৎসকরা দাবি করেন, বিশ্বের প্রথমবারের মতো এমন অস্বাভাবিক হৃদপিণ্ডের গঠনের রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত হৃদযন্ত্রের ভালভ রোবোটিক পদ্ধতিতে প্রতিস্থাপন করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
বুকের মাঝখান কেটে প্রচলিত ওপেন-হার্ট সার্জারির পরিবর্তে চিকিৎসকরা মাত্র একটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। চিকিৎসকদের মতে, আয়নার প্রতিবিম্বের মতো উল্টো গঠনের হৃদপিণ্ডে এটিই বিশ্বের প্রথম রোবোটিক ভালভ প্রতিস্থাপনের ঘটনা।
রোগী জন্ম থেকেই দুটি বিরল হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন ওই ব্যক্তি। প্রথমটি ডেক্সট্রোকার্ডিয়া, যার ফলে তার হৃদপিণ্ড বুকের বাঁ পাশের পরিবর্তে ডান পাশে তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয়টি কনজেনিটালি কারেক্টেড ট্রান্সপোজিশন অব দ্য গ্রেট আর্টারিজ (সিসিটিজিএ)। এই অবস্থায় হৃদপিণ্ডের পাম্পিং প্রকোষ্ঠগুলোর সংযোগ স্বাভাবিক থাকে না। ফলে ডান দিকের নিচের প্রকোষ্ঠ বা রাইট ভেন্ট্রিকলকে বাম ভেন্ট্রিকলের কাজ করতে হয়। কার্ডিওথোরাসিক অ্যান্ড ভাসকুলার সার্জারি (সিটিভিএস) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. অনুভব গুপ্ত জানান, স্বাভাবিকভাবে হৃদপিণ্ডের ডান অংশ কম চাপে রক্ত ফুসফুসে পাঠায়, আর শক্তিশালী বাম অংশ অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পুরো শরীরে সরবরাহ করে। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে ভূমিকা উল্টো হয়ে গিয়েছিল। ড. গুপ্ত বলেন, রাইট ভেন্ট্রিকল স্বাভাবিকভাবে শুধু ফুসফুসে রক্ত পাঠানোর জন্য তৈরি। কিন্তু প্রায় চার দশক ধরে সেটিকেই পুরো শরীরে রক্ত পাম্প করতে হয়েছে। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ ট্রাইকাসপিড ভালভ, যা সাধারণত হৃদপিণ্ডের ডান পাশে থাকে, সেটিই এই রোগীর শরীরে প্রধান পাম্পিং ভালভ হিসেবে কাজ করছিল। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ বহন করার ফলে রাইট ভেন্ট্রিকল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ট্রাইকাসপিড ভালভও ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেটি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ড. গুপ্ত বলেন, এ ধরনের জন্মগত ত্রুটি অনেক সময় কয়েক দশক পর্যন্ত কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। রোগীরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর, যখন হৃদপিণ্ড আর অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে পারে না, তখনই সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি জানান, চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় এ ধরনের কিছু রোগীর তথ্য পাওয়া গেলেও, একই ধরনের রোগীর অস্ত্রোপচারের একমাত্র প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ২০১১ সালের। সেখানে প্রচলিত ওপেন-হার্ট সার্জারি করা হয়েছিল। ফলে সফদরজং হাসপাতালের চিকিৎসকদের সামনে অনুসরণ করার মতো কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ ছিল না। অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসকরা সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে রোগীর হৃদপিণ্ডের ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল তৈরি করেন। হৃদপিণ্ড ডান পাশে থাকায় সার্জনদের পুরো অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনাই উল্টোভাবে সাজাতে হয়। যে অস্ত্রোপচার সাধারণত রোগীর ডান দিক থেকে করা হয়, সেটি এবার বাম দিক থেকে করতে হয়েছে। এজন্য রোবোটিক যন্ত্রের প্রবেশপথ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম এবং পুরো কৌশল নতুন করে নকশা করতে হয়। ড. গুপ্ত বলেন, আমরা পুরো অস্ত্রোপচারটিই আয়নার মতো উল্টোভাবে পরিকল্পনা করেছি। রোগীর শারীরিক গঠনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি যন্ত্র, প্রবেশপথ এবং সার্জারির কৌশল নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে।
চার দিন ধরে পরিকল্পনা করার পর প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়। প্রচলিত ওপেন-হার্ট সার্জারিতে বুকের হাড় কেটে হৃদপিণ্ড সাময়িকভাবে বন্ধ করে হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে রক্ত চলাচল চালিয়ে রাখা হয়। কিন্তু এই রোবোটিক অস্ত্রোপচারে মাত্র প্রায় ৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ একটি ছোট ছিদ্র দিয়েই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর বুকের হাড় কাটতে হয়নি, পাঁজরও আলাদা করতে হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। ড. অনুভব গুপ্ত বলেন, এই সফল অস্ত্রোপচার প্রমাণ করেছে যে অত্যন্ত জটিল জন্মগত হৃদরোগও এখন স্বল্প আক্রমণাত্মক রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তিনি বলেন, এখন অন্য হাসপাতালও একই ধরনের অস্ত্রোপচার করতে পারবে। আমাদের মতো শুরু থেকে নতুন পরিকল্পনা করতে হবে না। একই ধরনের হৃদপিণ্ডের গঠনের রোগীদের জন্য এখন একটি পরীক্ষিত মিররড বা বাম দিকভিত্তিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি অনুসরণ করা যাবে।
