প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম পরিবর্তন করেছে। বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম এই দেশটি এখন থেকে রিপাবলিক অব নাওয়েরো নামে পরিচিত হবে। শুধু নামই নয়, দেশটির আন্তর্জাতিক কোড, নাগরিকদের পরিচয় এবং বিভিন্ন সরকারি নথিতেও পরিবর্তন আসছে। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নাওয়েরো। কঠিন অতীত পেরিয়ে দেশটি এবার নিজেদের ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়কে সামনে আনতেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড আদেয়াং জানান, নতুন নামটি দেশের জাতীয় ভাষায় ব্যবহৃত প্রকৃত বানান ও উচ্চারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের পরিচয়, ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার পদক্ষেপ।
জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই তাদের ওয়েবসাইটে দেশটির নতুন নাম রিপাবলিক অব নাওয়েরো হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। গত জুন মাসে দেশটির সরকারের অনুরোধের পর এই পরিবর্তন কার্যকর করা হয়।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটেও দেশটিকে নাওয়েরো নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কোড ও নাগরিকদের পরিচয়েও পরিবর্তন
নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশটির আন্তর্জাতিক কোড এনআরইউ থেকে পরিবর্তন করে এনআরও করা হবে। একই সঙ্গে দেশটির নাগরিকদের আর ‘নাউরুয়ান’ না ডেকে বলা হবে ‘দেঈ-নাওয়েরো’। বিদেশে দীর্ঘদিন দেশটির নাম “নাউ-রু” উচ্চারণে পরিচিত ছিল। তবে নতুন নাম “নাও-এরো” উচ্চারণ করা হবে।
দেশটির সরকার জানিয়েছে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপরাষ্ট্রটি তাদের ঐতিহ্যবাহী নাম পুনরুদ্ধার করছে। অতীতে বিদেশিদের উচ্চারণের সুবিধার জন্য দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে নাউরু নামে পরিচিত হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল কেবল ব্যবহারিক সুবিধার জন্য; দেশের প্রকৃত স্থানীয় নাম ছিল নাওয়েরো।
গণভোট ছাড়াই অনুমোদন
দেশটির সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি সংসদে প্রয়োজনীয় দুই দফা ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। যদিও সংশোধনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।
প্রেসিডেন্ট আদেয়াং মে মাসে এই উদ্যোগের সময় একটি গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সরকার জানিয়েছে, ব্যাপক আলোচনা শেষে আইনপ্রণেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এ বিষয়ে গণভোটের প্রয়োজন নেই।
সরকারের ভাষ্য, নাওয়েরো নামটি কখনো হারিয়ে যায়নি; এটি শুধু পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করার অপেক্ষায় ছিল। আরও বলা হয়েছে, নাওয়েরো নামটিই জনগণের প্রকৃত পরিচয়। এটি জাতীয় প্রতীক (কোট অব আর্মস)-এ রয়েছে, মানুষের মুখে মুখে ব্যবহৃত হয় এবং সংবিধানেও স্বীকৃত।
মাত্র ১২ হাজার জনসংখ্যা নিয়ে নাওয়েরো বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার বিচারে এর আগে রয়েছে তুভালু এবং ভ্যাটিকান সিটি। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পালাউ চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ।
প্রবাল ও চুনাপাথরের এই ছোট্ট দ্বীপটি একসময় জার্মানির উপনিবেশ ছিল। পরে অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনের অধীনে থাকার পর ১৯৬৮ সালে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ফসফেটের সমৃদ্ধি থেকে অর্থনৈতিক সংকট
১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনির কারণে নাওয়েরো বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিল। কিন্তু খনি শিল্পের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকে দেশটি মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দেশটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব কর্মসূচি চালু করেছে। এই অর্থ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সমুদ্রের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নাওয়েরোর এই সিদ্ধান্তকে ঔপনিবেশিক অতীত থেকে সরে এসে নিজস্ব পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৮ সালে আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য সোয়াজিল্যান্ড তাদের নাম পরিবর্তন করে এসওয়াতিনি রাখে। এছাড়া ২০২২ সালে তুরস্কও জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির নাম তুর্কির পরিবর্তে তুর্কিয়ে হিসেবে ব্যবহারের অনুরোধ জানায়।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, নাওয়েরোর নাম পরিবর্তনের ফলে দেশটির জাতীয় উড়োজাহাজ ও জাহাজগুলোর নামও পরিবর্তন করা হবে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও নতুন নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে দেশটির সরকার।
