আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাই-সংশ্লিষ্ট সব মামলার বিচার সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিং এ সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি সন্তোষজনক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত বছরের আগস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনাল একযোগে কাজ করছে। তদন্ত সংস্থায় ২৩ জন কর্মকর্তা এবং প্রসিকিউশন টিমে বর্তমানে ২০ জন আইন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, এখন পর্যন্ত ৬টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এর মধ্যে তিনটির বিচার তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে এবং তিনটির বিচার তার দায়িত্ব নেয়ার পর সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি মামলায় দীর্ঘ তদন্ত, ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছে। তারপরও মাত্র এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ছয়টি মামলার বিচার শেষ করতে পারাকে তিনি "দ্রুত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত বিচার" বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, 'এর চেয়েও দ্রুত বিচার করলে সেই বিচার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারত। আমরা স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার সম্পন্ন করছি।'
তিনি জানান, চলতি মাসেই আরও তিনটি মামলার রায় হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মামলায় যুক্তিতর্ক চলছে। মাহবুব উল আলম হানিফের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে, যে কোনো দিন রায় হতে পারে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর বহুল আলোচিত তাইম ভূঁইয়া হত্যা মামলার যুক্তিতর্কও শিগগিরই শুরু হবে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলাও সাক্ষ্যগ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের মামলাগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। একইসঙ্গে সারাদেশে সংঘটিত প্রায় তিন হাজারের বেশি কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাও তদন্তাধীন রয়েছে। কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরাম হত্যা এবং শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ একাধিক মামলার বিচার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তদন্ত সংস্থা ১২টি মামলার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেগুলোর ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হচ্ছে। আরও কয়েকটি প্রতিবেদন শিগগিরই জমা দেওয়া হবে।
পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পলাতক অবস্থায় রায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। তবে যেসব মামলায় অর্থদণ্ড বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে এই প্রথম সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জুলাইয়ের মামলায় 'পিক অ্যান্ড চুজ' বা বাছাই করে বিচার করার অভিযোগ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্ত কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তদন্ত করেন এবং প্রসিকিউশন সেখানে হস্তক্ষেপ করে না। কোনো মামলায় যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকলে কাউকে অভিযুক্ত করা হয় না, আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকলে ব্যক্তিগত ধারণা বা জনমতের তোয়াক্কা না করে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন ফেরত পাঠিয়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে নতুন আসামি যুক্ত করেও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্ধারণ একটি জটিল বিষয়। যেসব অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার্য নয়, সেগুলো নিম্ন আদালতেই বিচার হওয়া উচিত। আবার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অন্য কোনো আদালতে হওয়া উচিত নয়। এই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের আপিল বিষয়ে তিনি বলেন, 'অটোমেটিক আপিল' বলে কোনো বিধান নেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আপিল করলে তা 'অ্যাজ অব রাইট' গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পলাতক অবস্থায় কোনো আসামি আইনের এই সুবিধা ভোগ করতে পারেন না।
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কোনো এখতিয়ার নেই। তিনি কোথায়, কীভাবে বা কখন বক্তব্য দেবেন, সেটি ট্রাইব্যুনালের বিষয় নয়। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব হলো দণ্ড কার্যকরের আইনগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সম্পর্কে তিনি বলেন, খসড়া আইন পর্যালোচনা করে বড় ধরনের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় পাওয়া যায়নি। কোনো গুম যদি পরিকল্পিত ও ব্যাপক (systematic and widespread) আকারে সংঘটিত হয়, তাহলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। আর বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনা স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইনে বিচার হবে। চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা হবে।
