কিছু মানুষ মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয়

কল্পনা নয়, গবেষণা

কিছু মানুষ মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয়

ফন্ট সাইজ:

আমাদের কাছে মশা মূলত বিরক্তি ও অস্বস্তির কারণ। ভয়ের কারণতো আছেই। কিন্তু আপনিই যদি হন মশার কাছে বিরক্তিকর তাহলেতো আপনি রীতিমতো ভাগ্যবান বটে। কারণ, মশাই আসলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী।  আর সেটি আপনার কাছ থেকে দূরে থাকলে মন্দ কী। 

মশা প্রাণঘাতি- এর প্রধান কারণ বিভিন্ন মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের অতুলনীয় সক্ষমতা। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু জ্বর, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসসহ আরও অনেক রোগের বাহক হিসেবে মশা কাজ করে।
ধারণা করা হয়, প্রতি বছর মশাবাহিত রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। তাই মশা কেন এবং কীভাবে মানুষকে খুঁজে বের করে, তা বোঝার চেষ্টা বিজ্ঞান গবেষণার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
iScience সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা এই রহস্য উন্মোচনের পথে আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। গবেষণাটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে কেন মশা কিছু মানুষের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে বেশি আকৃষ্ট হয়, অথচ অন্যদের প্রায় উপেক্ষা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই পরীক্ষায় মায়ামির ১১৯ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। প্রত্যেককে তাদের একটি হাত অলফ্যাক্টোমিটার নামে পরিচিত একটি লম্বা নলের ভেতরে রাখতে বলা হয়।
নলের অপর প্রান্তে গবেষকেরা তিনটি ভিন্ন প্রজাতির মশা ছেড়ে দেন— এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti), এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Aedes albopictus) এবং কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়াটাস (Culex quinquefasciatus)। এরপর তারা পর্যবেক্ষণ করেন কোন মশা কোন ব্যক্তির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে।



আমরা ইতোমধ্যেই জানি যে, মশা মানুষের শরীরের গন্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এ ছাড়াও তারা আরও নানা ধরনের অজান্তে দেয়া সংকেত অনুসরণ করে। তবে শরীরের গন্ধের সূক্ষ্ম পার্থক্য কেন মশার আকর্ষণকে প্রভাবিত করে, তা এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
এর একটি কারণ হলো মানবদেহের গন্ধের জটিল গঠন। আমাদের ত্বক থেকে নির্গত অনেক পদার্থ প্রথমে গন্ধহীন থাকে। পরে ত্বকে থাকা অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস (VOCs) নামে পরিচিত গ্যাসে রূপান্তরিত হয়, যা শরীরের স্বতন্ত্র গন্ধ তৈরি করে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের ত্বক থেকে উৎপন্ন এক হাজারেরও বেশি ধরনের VOC থাকতে পারে, যার অনেকগুলোর বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ফলে ঠিক কোন রাসায়নিক উপাদান কোন ধরনের গন্ধ সৃষ্টি করে এবং সেগুলো কীভাবে মশার আচরণকে প্রভাবিত করে, তা নির্দিষ্ট করে বলা এখনো বেশ কঠিন।
এর সঙ্গে যদি যোগ করা হয় যে পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৩,৬০০টি পরিচিত মশার প্রজাতি রয়েছে এবং প্রতিটি প্রজাতিই সম্ভবত ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের প্রতি আলাদা পছন্দ গড়ে তুলেছে, তাহলে বোঝা যায় মশার গন্ধ শনাক্তকরণ ও আকর্ষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের এখনো অনেক কিছু জানার বাকি রয়েছে।
গবেষণাপত্রে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি র স্নায়ুবিজ্ঞান ও জিনতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ডেজেনারোর নেতৃত্বাধীন গবেষক দল লিখেছেন, “ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মশা যখন নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়, তখন মানুষের ত্বকে থাকা অণুজীব এবং/অথবা শরীরের গন্ধের সঙ্গে এর একটি সম্পর্ক রয়েছে।”

তারা আরও বলেন, “আগের গবেষণাগুলোতে বিভিন্ন মশার প্রজাতির কাছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির আকর্ষণীয়তা তুলনা করা হয়েছে। তবে একাধিক মশার প্রজাতির আকর্ষণের মাত্রাকে পৃথক মানুষের ভোলাটাইল রাসায়নিক উপাদানের সমষ্টি (ভোলাটাইলোম) এবং ত্বকের অণুজীবসমষ্টি (মাইক্রোবায়োম)-এর সঙ্গে একযোগে তুলনা করে বিশ্লেষণ করার কাজ, আমাদের জানা মতে, আগে কখনো করা হয়নি।”
অলফ্যাক্টোমিটার ব্যবহার করে পরিচালিত পরীক্ষায় ডেজেনারোর গবেষক দল দেখতে পেয়েছে যে এডিস ইজিপ্টাই (Ae. aegypti) প্রজাতির মশা নারীদের তুলনায় পুরুষদের প্রতি সামান্য বেশি আকর্ষণ দেখিয়েছে। তবে পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত অন্য দুটি প্রজাতির মশার ক্ষেত্রে এমন কোনো স্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক পছন্দ লক্ষ্য করা যায়নি।

গবেষকেরা আরও দেখেছেন, কিছু স্বেচ্ছাসেবক নির্দিষ্ট একটি মশার প্রজাতির কাছে বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হলেও, এর অর্থ এই নয় যে তারা তিনটি প্রজাতির কাছেই সমানভাবে আকর্ষণীয় ছিলেন।

একইভাবে, কিছু অংশগ্রহণকারী এক বা একাধিক মশার প্রজাতির কাছে তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় মনে হলেও, তারা সব ধরনের মশার কাছেই যে কম আকর্ষণীয় হবেন, এমন কোনো ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস যে ব্যক্তিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তাদের মধ্যে কিছুটা দুর্বল সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে গবেষকেরা বলছেন, প্রতিটি মশার প্রজাতিই মূলত ভিন্ন ভিন্ন মানুষের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি বেশি আকর্ষণ দেখিয়েছে।
অংশগ্রহণকারীদের হাত থেকে সংগ্রহ করা ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস (VOCs) বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এডিস ইজিপ্টাই (Ae. aegypti) এবং কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়াটাস (Cx. quinquefasciatus) এমন ব্যক্তিদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছে, যাদের শরীরে এমন কিছু VOC-এর মাত্রা কম ছিল যেগুলো সাধারণত মশার আকর্ষণ কমায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই মশাগুলো কার শরীরে বসবে তা নির্ধারণের সময় কিছু নির্দিষ্ট VOC এড়িয়ে চলে।
অন্যদিকে, এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Ae. albopictus* কিছু বিশেষ আকর্ষণীয় গন্ধ-উৎপাদক রাসায়নিক যৌগের প্রতি বেশি সাড়া দিয়েছে।
গবেষণায় ১১৯ জন অংশগ্রহণকারীর ত্বকের মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণ করে মোট ২৪৬ ধরনের ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়। তবে গবেষকেরা বিস্মিত হন এ দেখে যে, সব অংশগ্রহণকারীর ত্বকে মাত্র একটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি অভিন্নভাবে উপস্থিত ছিল।
যদিও বিভিন্ন মশার প্রজাতি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার প্রতি আলাদা পছন্দ দেখিয়েছে, তবুও ফলাফলে দেখা যায় তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ধারাবাহিকভাবে মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় ছিল।
গবেষকেরা লিখেছেন, “এডিস ইজিপ্টাই, এডিস অ্যালবোপিক্টাস এবং কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়াটাস—এই তিন প্রজাতির মশার ক্ষেত্রেই আমরা এমন তিনটি মূল ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছি। যা বেশি আকর্ষণীয় ব্যক্তিদের ত্বকে পাওয়া গেছে, কিন্তু কম আকর্ষণীয় ব্যক্তিদের মূল মাইক্রোবায়োমে পাওয়া যায়নি।”

(সায়েন্স অ্যালার্ট থেকে)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন