বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পৃথক কয়েকটি কূটনৈতিক ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে তাদের প্রকৃত অর্থ ধরা পড়ে না। কিন্তু সেগুলোকে একই সুতোয় গাঁথলে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও তেমনই। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের ঢাকা সফর, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং এর পরপরই মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার ঢাকা সফর সব মিলিয়ে এক নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি নিছক সফর বিনিময়ের কাহিনি নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়া সেই পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একসময় দক্ষিণ এশিয়াকে বিশ্বের একটি সংকটপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই অঞ্চলই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ। বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর, মালাক্কা প্রণালি থেকে লোহিত সাগর এই সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তা এখন বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে বাংলাদেশ আর কেবল একটি নদীমাতৃক দেশ নয়; এটি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে অবস্থানকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ভূগোল। ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু অর্থনীতি নয়, তার ভৌগোলিক অবস্থানও। বাংলাদেশের অবস্থান আজ সেই অর্থে নতুন কৌশলগত মূল্য অর্জন করেছে। পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিমে ভারতীয় উপমহাদেশ, উত্তরে হিমালয় অঞ্চল এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এই চারটি ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের কূটনীতিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সার্জিও গরের সফর এই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি অংশ। তাঁর কর্মসূচিতে যেমন রাজনৈতিক সংলাপ ছিল, তেমনি ছিল রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবিক, আঞ্চলিক এবং কৌশলগত সব দিক থেকেই মূল্যায়ন করছে। রোহিঙ্গা সংকট আজ আর শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকলেও সংকটের স্থায়ী সমাধানে বৈশ্বিক কূটনীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে তা কেবল সহায়তা বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি এবং আঞ্চলিক ঐকমত্য গঠনে আরও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন এক কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রবাণিজ্য মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় নৌপথ অতিক্রম করে। জ্বালানি সরবরাহ, কনটেইনার পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পথগুলোর স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় অংশগ্রহণকে কেবল সামরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মূলত অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অংশ।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক প্রশ্নটি সামনে আসে। বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি নিরাপত্তা উদ্যোগকে অন্য কোনো শক্তি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকে তার অংশীদারিত্ব জোরদার করছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে বন্দর, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়াচ্ছে। ভারত বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে তার নিরাপত্তা উপস্থিতি শক্তিশালী করছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত করছে। এই প্রতিযোগিতার ভেতরে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশল হবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে সবার সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা ধরে রাখা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যও সেই পথের দিকনির্দেশনা দেয়। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতি আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রাসঙ্গিক। তবে এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতার ওপর। কারণ আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিরপেক্ষতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং সক্রিয় ভারসাম্য রক্ষা।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও একই বাস্তবতার মুখোমুখি। শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট কাটিয়ে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ছে। নেপাল ও ভুটান ভারত ও চীনের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মালদ্বীপে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন স্পষ্ট। পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। ফলে গোটা দক্ষিণ এশিয়া এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ভূরাজনীতি আর কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রশ্নও।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো এই বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতাকে উন্নয়নের পুঁজিতে রূপান্তর করা। কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর, সমুদ্র অর্থনীতি, বন্দর উন্নয়ন, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ আহরণ। কৌশলগত অংশীদারিত্ব তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জনগণের জীবনমানে প্রতিফলিত হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করছে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু আগ্রহ বাড়া আর জাতীয় স্বার্থ রক্ষা দুটি এক বিষয় নয়। ইতিহাস বলে, ভৌগোলিক গুরুত্ব যেমন সুযোগ এনে দেয়, তেমনি ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সেটিই ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই কূটনৈতিক ভারসাম্য, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট অগ্রাধিকারই হতে হবে বাংলাদেশের পথনির্দেশক।
আজ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি অন্যের কৌশলের অংশ হবে, নাকি নিজের কৌশল নিজেই নির্ধারণ করবে? রাষ্ট্রের পরিপক্বতা এখানেই কে কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলো, সেটি নয়; বরং সেই সম্পর্ক দেশের সার্বভৌম স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে কতটা এগিয়ে নিল, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড।
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশকে তাই কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবে নয়, বরং দুই সমুদ্র, দুই অঞ্চল এবং বহু শক্তির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সুযোগের এই সময়ে বিচক্ষণ কূটনীতি, সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্বই হতে পারে আগামী দিনের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
