সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাতের ফলে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল এবং হরমুজ প্রণালীর মতো বৈশ্বিক সামুদ্রিক কৌশলগত জলপথগুলোর ভঙ্গুরতা বিশ্বজুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংকটের চেয়েও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে মালাক্কা প্রণালী।
দ্য এজ মালয়েশিয়া জানিয়েছে, কুয়ালালামপুর-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স সিকিউরিটিজ তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে তা বাণিজ্য-নির্ভর মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার চেয়েও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মালাক্কা প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে ২০২৭ সালে মালয়েশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যেখানে বর্তমানে তাদের মূল পূর্বাভাস রয়েছে ৪.৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া এপ্রিল মাসে মালাক্কা প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাব তুলে ধরে পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করলেও, উপকূলীয় তিন দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া জলপথটিকে উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবুও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন বা যেকোনো সামুদ্রিক অবরোধের মতো ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অ্যাপেক্স সিকিউরিটিজের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাঘাতের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে মালয়েশিয়ার জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ভিন্ন প্রভাব পড়তে পারে। ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মৃদু ব্যাঘাত ঘটলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে প্রায় ৩.৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ৫১ থেকে ৭৫ শতাংশের মাঝারি ব্যাঘাতে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে ৩.১ থেকে ৩.৫ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে। আর প্রায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধের মতো চরম পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে ২.৫ থেকে ৩.১ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
মালয়েশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম মূল ভিত্তি এই প্রণালী। ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশটির মোট বাণিজ্যের প্রায় ৪৮ শতাংশই সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। প্রধান বন্দরগুলোর অবস্থান ও পণ্য পরিবহনের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ হলে মালয়েশিয়ার মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩৬.৮ শতাংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিকল্প পথ হিসেবে ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের মধ্য দিয়ে জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও তা অত্যন্ত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। এতে পরিবহন ব্যয় ও পৌঁছানোর সময় অনেকাংশে বেড়ে যাবে, যা মালয়েশিয়ার প্রধান রপ্তানি খাত বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং কমোডিটি খাতগুলোকে চরম লজিস্টিক চ্যালেঞ্জে ফেলবে।
এদিকে দ্য স্টার জানিয়েছে, এছাড়া বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারেও এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এই প্রণালী দিয়ে দৈনিক ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়ে আসছে, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের ২৯.১ শতাংশ এবং মোট বিশ্ব সরবরাহের ২২.২ শতাংশ। প্রণালীটিতে বাধা সৃষ্টি হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলার বা তার বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে আংশিক সরকারি ভর্তুকি বজায় থাকা সত্ত্বেও দেশের মূল মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের ওপরে চলে যেতে পারে।
যদিও অ্যাপেক্স সিকিউরিটিজ জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী মালাক্কা প্রণালী অবরোধের মতো ঘটনা একটি অতি-বিরল দৃশ্যপট, যা মূল পূর্বাভাসের অংশ নয়। প্রণালীটির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় আঞ্চলিক সরকারগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেকোনো মূল্যেই এর স্বাভাবিক চলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সচেষ্ট থাকবে বলে উঠে এসেছে দ্য এজ মালয়েশিয়ার সংবাদে।
