ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ভিডিও ফেসবুক থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, বরং এর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানিয়েছে দেশটির সংসদের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। খবর এনডিটিভির।
কমিটির চেয়ারম্যান ও বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মেটার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট নিয়েও কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে কোম্পানিটিকে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে নিশিকান্ত দুবে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভিডিও সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি তা না করলে ভারতে মেটার ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
ভারতের আইনে ‘সেফ হারবার’ বিধান অনুযায়ী, যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত তৃতীয় পক্ষের কনটেন্টের জন্য সরাসরি আইনি দায় থেকে সুরক্ষা পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গুগল, মেটা ও ইউটিউবের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন।
বৈঠকে এক জ্যেষ্ঠ বিজেপি সাংসদ মেটাকে প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভিডিও সরানোর দায় কার এবং কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল।
সরকারি সূত্রের দাবি, ওই সাংসদ জানতে চান, প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কেন সরানো হলো? এর জন্য দায়ী কে? যখন ফেসবুকে আরও অনেক আপত্তিকর কনটেন্ট রয়ে গেছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওই বা কেন সরানো হলো? শেষ পর্যন্ত এর দায় কার?
এর জবাবে মেটা ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে ওই সাংসদ স্পষ্ট করে দেন, বিষয়টি কেবল ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর ভিডিওই এভাবে সরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে ভারতের সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা কোথায়?
অ্যালগরিদম নিয়েও প্রশ্ন
বৈঠকের পর নিশিকান্ত দুবে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম নিয়ে সংসদীয় কমিটির সব সদস্য একমত এবং এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়।
তার দাবি, মেটা, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইউটিউবের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করছে, তা দেশের জানা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিজেপি, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও আম আদমি পার্টির সম্মিলিত ভিউয়ারশিপ যেখানে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ, সেখানে কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বা এনজিও নয়- এমন কিছু নতুন গোষ্ঠীর ভিউয়ারশিপ ২ কোটি ৭০ লাখে পৌঁছে যাচ্ছে।
দুবের অভিযোগ, নতুন অ্যাকাউন্ট বা গোষ্ঠীগুলোকে অ্যালগরিদমে অগ্রাধিকার দেয়ার নীতির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
‘দেশ অস্থিতিশীল করার মানসিকতা’
দুবে আরও বলেন, তাদের মানসিকতা দেশকে অস্থিতিশীল করা। তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে, প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে ছিল না। রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ভিডিওটি সরানো ছিল। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
তার ভাষায়, সংসদীয় কমিটি দুটি সুপারিশ করেছে- প্রথমত, এই ঘটনার জন্য মার্ক জাকারবার্গকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, তিনি তা না করলে মেটার ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
এর আগে গত সপ্তাহে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম পরিচালনা এবং জনশৃঙ্খলায় এর প্রভাব নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে মেটার বৈশ্বিক প্রতিনিধিদের তলব করে।
মেটা দাবি করেছিল, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে মোদির ভিডিওটি সাময়িকভাবে সরে যায়। তবে সরকারি সূত্রের মতে, মন্ত্রণালয় সেই ব্যাখ্যাকে “অপর্যাপ্ত” বলে মনে করেছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদিকে লক্ষ্য করে বিকৃত (মরফড) ছবি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি পোস্ট ছড়ানোর অভিযোগে মেটা ইন্ডিয়ার প্রধান অরুণ শ্রীনিবাস এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কয়েকটি অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হায়দরাবাদ সাইবার ক্রাইম পুলিশ।
