পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (উত্থানজনিত সমস্যা) চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে পরিচিত ভায়াগ্রা ক্যানসারের বিস্তার রোধেও কার্যকর হতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ইসরাইলি গবেষকদের দাবি, তারা এমন একটি জৈবিক প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছেন, যার মাধ্যমে ভায়াগ্রার সক্রিয় উপাদান সিলডেনাফিল ক্যানসার কোষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। সোমবার (০৩ আগস্ট) টাইমস অব ইসরাইলের অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে সমীক্ষাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ক্যানসার রিসার্চ-এ জুলাই মাসে প্রকাশিত হয়েছে।
ইসরাইলের ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গবেষকদের মতে, সিলডেনাফিল ক্যানসার কোষে কোলেস্টেরল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বাধাগ্রস্ত করে। কোলেস্টেরলই ক্যানসার কোষের জন্য এমন একটি অপরিহার্য উপাদান, যা ব্যবহার করে তারা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে বা মেটাস্টেসিস ঘটায়।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন ড. ইয়ারডেন আরিয়াভ। এতে ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আয়েলেত এরেজের গবেষণাগার, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এইতান রুপিনের গবেষণাগার, ইসরাইলের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্লালিত হেলথ সার্ভিসেস এবং ক্লালিত-বেইলিনসন হাসপাতালের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা অংশ নেন।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ইঁদুরের ক্যানসার মডেল, মানবদেহ থেকে সংগৃহীত ক্যানসার কোষের সংস্কৃতি এবং ক্লালিতের প্রায় ৫০ লাখ সদস্যের ২০ বছরের স্বাস্থ্যতথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব রোগী ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে একই সঙ্গে সিলডেনাফিল এবং স্ট্যাটিন (কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ) গ্রহণ করেছিলেন, তাদের বেঁচে থাকার হার তুলনামূলক বেশি ছিল।
পরীক্ষাগারে মূলত ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসার, মেলানোমা এবং ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করা হয়। অধ্যাপক আয়েলেত এরেজ বলেন, বাস্তব রোগীর তথ্যও ইঁদুরের ওপর পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে মিল দেখিয়েছে। বিশেষ করে ফুসফুস, কোলন ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে।
তার ভাষায়, গবেষণার পরবর্তী ধাপ হবে নারীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখন হলো ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের ভায়াগ্রা দিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা।
কীভাবে কাজ করে ভায়াগ্রা?
সিলডেনাফিল প্রথমে হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কারণ এটি রক্তনালি প্রসারিত করতে সক্ষম। পরে এটি পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশনের কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৮ সালে এ উদ্দেশ্যে অনুমোদন লাভ করে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পুরুষ ও নারী—উভয় ধরনের ইঁদুরের ক্যানসার মডেল এবং মানব ক্যানসার কোষে ওষুধটি প্রয়োগ করেন। উচ্চ-রেজোলিউশনের কোষীয় ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা দেখতে পান, সিলডেনাফিল দ্রুত ফসফোডাইএস্টারেজ টাইপ-৫ (পিডিই৫) নামের একটি এনজাইমকে বাধা দেয়। এর ফলে কোষে সাইক্লিক জিএমপি নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বার্তাবাহকের মাত্রা বেড়ে যায়।
এরপর এই জিএমপি এমন একটি প্রোটিনকে আটকে দেয়, যা ক্যানসার কোষে কোলেস্টেরল পরিবহন করে। কোলেস্টেরলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে ক্যানসার কোষ শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা হারায় এবং মেটাস্টেসিস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অধ্যাপক এরেজ বলেন, আমরা একটি নতুন জৈবিক পথ আবিষ্কার করেছি এবং দেখিয়েছি কীভাবে এটিকে চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে গবেষণায় দেখা যায়, ক্যানসার কোষ সহজে হার মানেনি। বাইরের কোলেস্টেরল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তারা নিজেরাই নতুন করে কোলেস্টেরল তৈরি করতে শুরু করে।
এরপর গবেষকরা স্ট্যাটিন প্রয়োগ করেন। স্ট্যাটিন এমন একটি বহুল ব্যবহৃত ওষুধ, যা শরীরে কোলেস্টেরল উৎপাদন কমায়। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ স্ট্যাটিন গ্রহণ করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্যাটিন ও সিলডেনাফিল একসঙ্গে ব্যবহার করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ক্যানসারের বিস্তার আরও কার্যকরভাবে ঠেকানো সম্ভব হয়।
৫০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যতথ্যে মিলল একই ইঙ্গিত
ক্লালিত হেলথ সার্ভিসেসের জ্যেষ্ঠ মহামারিবিদ ড. সামাহ হায়েক জানান, ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষকরা পরীক্ষাগারের ফল বাস্তব রোগীদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে তাদের সহায়তা চান।
তিনি বলেন, গবেষকেরা জানতে চেয়েছিলেন, যেসব রোগী ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার ছয় মাস আগে ভায়াগ্রা ও স্ট্যাটিন গ্রহণ করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে কী ফল পাওয়া গেছে।
ড. হায়েক বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত ও মহামারিবিদ্যাগত পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা নানা প্রভাবক বিবেচনায় নিয়েছি। দেখা গেছে, ফলাফল ইঁদুরের গবেষণায় পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এভাবেই পরীক্ষাগারের গবেষণা ও বাস্তব রোগীর তথ্য একত্র করে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে।
গবেষণায় যুক্ত না থাকলেও তেল আবিব মেডিকেল সেন্টারের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ড. ইদো উলফ বলেন, এই গবেষণা ক্যানসারের জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এতদিন তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত দিক তুলে ধরেছে।
তার মতে, মেটাস্টেটিক ক্যানসার কোষ কোলেস্টেরলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কোষের ভেতরে কোলেস্টেরল পরিবহন ব্যাহত করা চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গবেষণাটি শুধু নতুন প্রক্রিয়া আবিষ্কারই করেনি, বরং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাস্তব স্বাস্থ্যতথ্য দিয়েও সেটিকে সমর্থন করেছে।
ড. উলফ বলেন, এই ফলাফল দেখায় যে, সিলডেনাফিল ও স্ট্যাটিনের মতো সহজলভ্য এবং বহুদিনের পরিচিত ওষুধকে নতুন উদ্দেশ্যে দ্রুত ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ড. হায়েক বলেন, এটাই অনুবাদধর্মী (ট্রান্সলেশনাল) বিজ্ঞান- যেখানে পরীক্ষাগারের গবেষণাকে মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়।
অধ্যাপক এরেজের মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় শুধু জিনগত পরিবর্তন বা টিউমারের পরিবেশের দিকে তাকালেই হবে না; রোগীকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, রোগী কী খাচ্ছেন, কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয় এবং কী ধরনের ওষুধ গ্রহণ করছেন- এসবও গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগীকে পুরো একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেই চিকিৎসার পরিকল্পনা করা উচিত।
