কমনওয়েলথ গেমসে এবারো পদক শূন্য বাংলাদেশ, দায় কার?

কমনওয়েলথ গেমসে এবারো পদক শূন্য বাংলাদেশ, দায় কার?

ফন্ট সাইজ:

আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল পর্দা নেমেছে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের। তবে বাংলাদেশের মিশন শেষ হয় ৩১শে জুলাই। চারটি ডিসিপ্লিনে ১৫ জন ক্রীড়াবিদ নিয়ে অংশ নিয়ে এবারো কোনো পদকের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসের হতাশা কাটার আগেই গ্লাসগো থেকেও ফিরতে হচ্ছে পুরোপুরি খালি হাতে। পারফরম্যান্সের বিচারে বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রীড়াবিদ ছিলেন প্রত্যাশার অনেক নিচে। বেশিরভাগই হিট পেরোতে পারেননি। অনেকে নিজেদের ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্সও করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ফলাফলও হয়েছে অনুমিত। অথচ ক্রীড়াবিদদের এই ব্যর্থতার বিপরীতে দলের একঝাক কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল না কোনো আত্মসমালোচনার ছাপ। গেমস চলাকালে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, দাওয়াত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব উপস্থিতিই যেন ছিল তাদের প্রধান ব্যস্ততা।

বাংলাদেশের গেমস শুরু হয়েছিল সাঁতার দিয়ে। প্রথম দিনেই হতাশ করেন সোনিয়া আক্তার ও সুকুমার রজবংশী। হিট পেরোনো তো দূরের কথা, গ্লাসগোতে নিজেদের ব্যক্তিগত সেরা টাইমিংও স্পর্শ করতে পারেননি তারা। পরে সামিউর রহমান রাফিও একই পরিণতি বরণ করেন। এবারের দলে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন বক্সার রাকিব হোসেন। প্রথম রাউন্ডে পাপুয়া নিউগিনির প্রতিপক্ষকে হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেন। সেখানেও জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন। তবে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বক্সারের কাছে হেরে তার পদক স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। দলের অন্য দুই বক্সার রুহিন রেজা ও জিনাত ফেরদৌস অবশ্য চরম হতাশ করেছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জিনাত আবারও রিংয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পারেননি। অথচ দেশের সম্ভাবনাময় বক্সারদের উপেক্ষা করে প্রতিবারই তাকে সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে ফেডারেশন। জিমন্যাস্টিকসেও ছিল একই চিত্র।

অ্যাথলেটিক্সে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমানকে ঘিরে। লন্ডনের পরিচিত পরিবেশে তিনি ভালো করবেন বলেই আশা করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বার্মিংহামের মতো গ্লাসগোতেও হিট পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাকে। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে শিরিন আক্তার, ৪০০ মিটারে লুসাদ ইসলাম এবং লং জাম্পে স্বপ্না আক্তারও নিজেদের ইভেন্টে পিছিয়ে ছিলেন। স্বপ্না ১২ প্রতিযোগীর মধ্যে ১১তম হয়েছেন।

বাংলাদেশ যখন কোনো পদকের সম্ভাবনাই তৈরি করতে পারেনি, তখন পাশের দেশ ভারত ইতিহাস গড়েছে। শুধু বক্সিংয়েই সাতটি স্বর্ণ ও তিনটি রৌপ্য মিলিয়ে মোট ১০টি পদক জিতে এক আসরে নিজেদের সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে ভারতীয় বক্সিং দল। এই সাফল্যে গেমসে ভারতের মোট পদকসংখ্যা পৌঁছেছে ৩৯-এ। পদক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিবর্ণ। বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদ এবার পদক জেতা তো দূরের কথা, কোনো ইভেন্টেই পদকের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি। একসময় শুটিং ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা।

কমনওয়েলথ গেমসে নিয়মিতই এই ডিসিপ্লিন থেকে পদক আসতো। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট গেমসে আবদুল্লাহ হেল বাকি ও শাকিল আহমেদ দুটি পদক এনে দিয়েছিলেন দেশকে। এরপর কমনওয়েলথ গেমস থেকে শুটিং বাদ পড়তেই বাংলাদেশের পদকখরাও যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়ও। অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, বক্সিংসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও কর্মকাণ্ড দেখে অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, প্রতিযোগিতার চেয়ে সফরের আমেজই ছিল বেশি।

গ্লাসগোতে একঝাক কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অথচ বর্তমান সরকার সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের মাসিক ভাতা হিসেবে এক লাখ দিচ্ছে। দেশের অনেক সরকারি চাকরিজীবীর বেতনও এর চেয়ে কম। কিন্তু এই সুযোগ পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ তদবির, লবিং ও দৌড়ঝাঁপ চলে, সেই একই নিষ্ঠা যদি অনুশীলন ও পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হতো, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে বারবার এমন বিব্রতকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতো না। কমনওয়েলথ গেমস শেষ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য থেকে গেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন- ব্যর্থতার দায় নেবে কে? চার বছর পর আবারও কি একই গল্পের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি এবার সত্যিই শুরু হবে আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির পথচলা?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন