সরকার জ্বালানি খাতে একটি ‘বিষাক্ত ব্যবস্থা’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে: তিতুমীর

সরকার জ্বালানি খাতে একটি ‘বিষাক্ত ব্যবস্থা’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে: তিতুমীর

ফন্ট সাইজ:

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে একটি ‘বিষাক্ত ব্যবস্থা’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় দেশকে আমদানিনির্ভরতার চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা অতীতের বিষাক্ত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না; সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।

রোববার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইআরএফ এবং ডিআরইপি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালাসহ অন্যরা বক্তব্য দেন। ধন্যবাদ বক্তব্য দেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে সরকারি কর্মসূচির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, মানুষের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের চাহিদা ও সচেতনতা তৈরি করা গেলে বাজারও সেই চাহিদা অনুসরণ করবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার নীতিগত সংস্কার, কর-প্রণোদনা, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সহজ অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তার ভাষায়, ‘প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষের চাহিদা তৈরি করা। চাহিদা তৈরি হলে সরবরাহও সেই পথেই এগোবে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণসাক্ষরতা অভিযান, খাল খনন কর্মসূচি এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল বলেই সফল হয়েছে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এনজিও, নাগরিক সমাজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে গ্যাস ও এলপিজির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় কমার পাশাপাশি সঞ্চয় বাড়বে এবং সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের আমদানি ব্যয়ও কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি জানান, সরকার সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদনে উৎসাহ দিচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর-কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ সহজ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণেও কাজ চলছে।
ড. তিতুমীর বলেন, প্রতিটি এনজিও তাদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে পুনঃঅর্থায়ন ও সহজ শর্তে অর্থায়নের নতুন উদ্যোগও নেয়া হবে।

দেশের জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি) সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের (ডিআরইপি) সমন্বয়ক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনা সাধারণত বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ু বা জলবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এখন সময় এসেছে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়ার। কারণ এটি বড় জমির প্রয়োজন ছাড়াই বাড়ির ছাদ, শিল্পকারখানা, কৃষিখামার কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে স্থাপন করা সম্ভব এবং বিদ্যমান বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামীদিনে বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানার রুফটপ সোলার, কৃষিতে অ্যাগ্রিভোল্টাইক, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সোলার হোম সিস্টেমই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।

ডিআরইপি সমন্বয়ক বলেন, বর্তমানে দেশে নেট মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সোলারের সক্ষমতা ২১৩ মেগাওয়াট। এর বাইরে নন-নেট মিটারিং রুফটপ সোলার ৯৪ মেগাওয়াট, সোলার হোম সিস্টেম ২৬৩ মেগাওয়াট, সৌরচালিত সেচ পাম্প ৬০ মেগাওয়াট, স্ট্রিটলাইট, চার্জিং স্টেশন ও অন্যান্য সৌরব্যবস্থা ১৭ মেগাওয়াট এবং মিনিগ্রিড প্রায় ৬ মেগাওয়াট। সবমিলিয়ে দেশে প্রায় ৬৫৫ মেগাওয়াট বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে উদ্যোক্তারা দ্রুত রুফটপ সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে সরকারও স্বীকার করছে যে জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটবে না এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন