ঢাকা-১৯ নির্বাচনী হালচাল

প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার-আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকা, পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। উঠান বৈঠকও করছেন পাশাপাশি ভোটারদের কাছে প্রার্থীরা গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ও ভোট প্রার্থনা করছেন। দলীয় নেতাকর্মীরাও ভোটারদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে ব্যানার-বিলবোর্ড স্থাপনের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে সাভার-আশুলিয়া। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকার সাভার উপজেলার শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, পাথালিয়া, সাভার ইউনিয়ন, সাভার পৌরসভা ও সাভার সেনানিবাস নিয়ে গঠিত আসনটি মূলত পোশাকশিল্প কারখানার জন্য শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৬ পুরুষ, ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ নারী ও ১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন এ আসনে। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলটি ‘বিএনপি’র ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দিলশানা পারুল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফারুক খান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. ইসরাফিল হোসেন সাভারী, জাতীয় পার্টির মো. বাহাদুর ইসলাম ইমতিয়াজ, গণঅধিকার পরিষদের শেখ শওকত হোসেন ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. কামরুল। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে ভোট দিতে পারবো। সঠিক নেতৃত্ব, যোগ্য প্রার্থী এবং যারা দেশ ও দশের উন্নয়নে কাজ করবেন আমরা তাকেই বেছে নেবো। সরজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-১৯-এ সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু এবারো ধানের শীষের কাণ্ডারি হয়েছেন। তার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপি’র (শাপলা কলি) দিলশানা পারুলের। তবে একই জোটের আরেক শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)’র প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী ও (ছাতা) মাঠে প্রচারণায় থাকায় জামায়াতের ভোট কোন বাক্সে গিয়ে পড়বে- এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। অন্যান্য দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। ভোটার ও সাধারণ মানুষের মতে, মূলত ঢাকা-১৯ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু এনসিপি’র প্রার্থী দিলশানা পারুলের থেকে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী সালাউদ্দিন বাবু। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের স্বাস্থ্য সেবা, ছেলেমেয়ের শিক্ষার ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। এবারের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু বলেন, এবারের নির্বাচনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গত ১৭ বছরের আন্দোলনের লক্ষ্যই ছিল জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করা। আমার ভোটারদের প্রতি আস্থা আছে, যেহেতু গত আমলে জেল খেটেছি, জুলুমের শিকার হয়েছি, আমার নামে অনেকগুলো মামলাও হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার শতভাগ বিশ্বাস, ভোটাররা ভোট দিয়ে আমাকেই নির্বাচিত করবেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে এলাকার নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদানসহ সাভারের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে আমার। পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগ করে নদী দূষণ বন্ধের উদ্যোগ নেবো। তবে নির্বাচনের সময় টানা ৩-৪ দিনের ছুটি থাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা বাড়ি চলে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এটা ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে এবং ভোটের গুরুত্ব বোঝাতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু আরও বলেন, প্রার্থী ছোট-বড় যে দলেরই হোক না কেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমি সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে আমার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি। তবে সাভারবাসী আমাকে ভালোভাবে চেনেন জানেন, আমার অতীতের কমান্ড, দলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থেকে ভোটাররা আমাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন বলে আমি শতভাগ বিশ্বাস করি। বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ১১ দলীয় জোট সমর্থিত এনসিপি’র প্রার্থী দিলশানা পারুল বলেন, ঢাকা-১৯ আসনে আমি প্রথম নারী এমপি প্রার্থী। এখানকার অধিকাংশ ভোটার পোশাক শ্রমিক এবং যাদের বড় একটা অংশ নারী ভোটার। এ ছাড়া, প্রচুর তরুণ ও নতুন ভোটার রয়েছে যারা পরিবর্তন চায়। এখানকার শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী ভোটাররা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছেন। সিনিয়র সিটিজেনদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাচ্ছি। মূলত এই ভোটাররাই আমার সম্বল। বিজয়ী হলে এলাকার মানুষের উন্নয়নে তরুণ শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল, কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি ভোটারদের কাছে। এ ছাড়া, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তিনি ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করে বলেন, আমি নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে অনেক সাড়া পাচ্ছি ভোটারদের কাছ থেকে, যার কারণে আমি নির্বাচিত হওয়ার শতভাগ আশাবাদী। নির্বাচিত হওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে কাজ শুরু করবো। সাভার-আশুলিয়াকে সব ধরনের চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত করবো। তুরাগ নদ ও বংশী নদীকে দূষণমুক্ত করে নদীর দুই পাশে প্রাকৃতিক পার্ক নির্মাণ করে স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের জায়গা তৈরি করার পরিকল্পনা আছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, এলডিপি প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীও বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী দাবি করেন। এবং আলোচিত রানা প্লাজা ধসের পরবর্তী কার্যক্রমে তার অবস্থান তুলে ধরে ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাতা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেছেন।
গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) প্রার্থী এডভোকেট শেখ শওকত হোসেন বলেন, সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় ৩০ লাখ লোকের বসবাস হলেও আশুলিয়া এলাকায় একটি সরকারি হাসপাতাল নেই। এখানে একজন শ্রমিক যদি দুর্ঘটনার শিকার হন, সাধারণ পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিতে নিতে সে মারা যাবে। আমার নির্বাচনী ইশতেহারে বেশি প্রাধান্য দেবো শ্রমিক অধ্যুষিত সাভার-আশুলিয়ার শ্রমিকদের বিষয়ে। তাদের বিভিন্ন দাবি পূরণ করা অতি জরুরি, যেমন: বেতন কাঠামো, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টস থেকে যেসব ঝুট বের হয় সেগুলো দিয়ে যদি শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে তহবিল তৈরি করে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহার করা, শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য প্রতিটি কারখানায় ডে-কেয়ার ব্যবস্থা, শ্রমিকদের জন্য কারখানায় যদি অর্ধেক মূল্যের দোকান করে দেয়া যায় যেখান থেকে শ্রমিকরা অর্ধেক মূল্যে প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারবেন- সেগুলোও এই ঝুটের টাকা দিয়েই করা সম্ভব। এ ছাড়া মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, যানজট নিরসনসহ ফুটপাথের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সাভার-আশুলিয়া নিয়ে ঢাকা-১৯ আসনটিতে বিভিন্ন শিল্পকারখানা থাকার কারণে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্ব বহন করার পরও দীর্ঘদিন ধরে এখানকার নাগরিকরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী দূষণ, পরিবেশ দূষণ, যানজটের ভোগান্তি, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ঝুট ব্যবসা দখল, চুরি-ডাকাতি ও কিশোর গ্যাং, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চলেছে।