বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিক পর্বতে তুষারধসে নিহত হয়েছেন। নেপালি বংশোদ্ভূত এই পর্বতারোহীর অভিযান সংগঠক প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেড শনিবার (১ আগস্ট) ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ব্রড পিকে তুষারধসের ঘটনায় পুরজাসহ ছয়জন পর্বতারোহী নিখোঁজ হন।
এনিয়ে সর্বশেষ ইনস্টাগ্রাম পোস্টে এলিট এক্সপেড জানায়, গভীর শোক ও হৃদয়বিদারক দুঃখের সঙ্গে আমরা নিশ্চিত করছি যে, ব্রড পিকে তুষারধসের পর নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে অভিযানের অন্য সদস্যরাও এই দুর্ঘটনায় বেঁচে নেই।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, আজ আমরা শুধু নিমসকেই নয়, এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো প্রত্যেককে স্মরণ করছি। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার বিশ্বস্ত আরোহী সঙ্গী ও গাইড পুর বাহাদুর গুরুং (ইউক্তা) এবং নিমা শেরপা। নিহতদের পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা ও প্রার্থনা রইল। এই অপূরণীয় ক্ষতির বেদনা লাঘব করার মতো কোনো ভাষা নেই। শোকের এই সময়ে সবার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান জানাতে আমরা সবার প্রতি অনুরোধ করছি।
বিশ্বের ১২তম উচ্চতম পর্বত ব্রড পিক পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান ও চীনের শিনজিয়াং সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত। এটি কে-টু পর্বতের খুব কাছেই।
তুষারধসটি ব্রড পিকের ওয়েস্ট রিজ বা পশ্চিম রিজের প্রচলিত আরোহনপথে আঘাত হানে। দুর্ঘটনাটি প্রায় ২১ হাজার ৬০০ থেকে ২১ হাজার ৮৫০ ফুট উচ্চতায় ঘটে বলে জানানো হয়েছে।
এলিট এক্সপেড তাদের শোকবার্তায় বলেছে, বিশ্ব আজ পর্বতারোহণের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন আরোহীকে হারালো। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সাহস, বিনয় এবং মানুষের সামর্থ্য আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি- এই বিশ্বাস দিয়ে লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, পুরজার অসাধারণ অর্জনের চেয়েও বড় ছিল মানুষের মধ্যে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জাগিয়ে তোলা। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা এবং সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, পুরজার দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব ও দৃঢ সংকল্পের ভিত্তিতেই এলিট এক্সপেড, নিমসদাই ফাউন্ডেশন, স্কাইডাইভ নিমসদাই এবং নিমসদাই স্টোর গড়ে উঠেছে। তার উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে।
একের পর এক রেকর্ড
নির্মল পুরজা একসময় বৃটিশ আর্মির ব্রিগেড অব গুর্খাস এবং পরে রয়্যাল মেরিনসের অভিজাত স্পেশাল বোট সার্ভিসের (এসবিএস) সদস্য ছিলেন।
পরবর্তীতে পূর্ণকালীন পর্বতারোহী হওয়ার পর তিনি একাধিক বিশ্বরেকর্ড গড়েন। ২০১৯ সালে তিনি ‘প্রজেক্ট পসিবল’ অভিযানের মাধ্যমে মাত্র ৬ মাস ৬ দিনে বিশ্বের ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
এছাড়া ২০২১ সালে তিনি ১০ সদস্যের নেপালি দলের অংশ হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-টু-এর প্রথম সফল শীতকালীন আরোহন সম্পন্ন করেন। নির্মল পুরজার অসাধারণ অভিযাত্রা নিয়ে নির্মিত নেটফ্লিক্সের প্রামাণ্যচিত্র ‘১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল’ তাকে আধুনিক পর্বতারোহণের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত করে।
এই প্রামাণ্যচিত্র বিশ্বজুড়ে উচ্চতর পর্বতারোহণের প্রতি নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল এবং নির্মল পুরজাকে লাখো মানুষের অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত করেছিল।
