চারদিকে শুধু রক্ত, আর কত লাশ পড়লে বিশ্ব জাগবে?

কাশ্মীরিদের আর্তনাদ

চারদিকে শুধু রক্ত, আর কত লাশ পড়লে বিশ্ব জাগবে?

ফন্ট সাইজ:

‘আজাদি, আজাদি’ স্লোগানে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) মুখর হয়ে ওঠে মধ্য লন্ডন। এদিন পাঁচ হাজারের বেশি বৃটিশ কাশ্মীরি পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে জড়ো হয়ে ইসলামাবাদ-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে (পিএজেকে/আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর) চলমান সামরিক অভিযানের অবসানের দাবি জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শিশু, নারী, পুরুষ এবং প্রবীণ উপস্থিত ছিলেন। খবর কাশ্মীর টাইমসের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ৩৬ ঘণ্টারও কম সময়ে এবং একটি কর্মদিবসে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই নিজেদের ব্যবসা বন্ধ রাখেন, কর্মস্থল থেকে ছুটি নেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করে লন্ডনে আসেন।
তাদের দাবি, নিজভূমিতে স্বজনেরা পাক সামরিক বাহিনীর অবরোধের মধ্যে আটকা পড়েছেন। পশ্চিম সাসেক্স থেকে একটি পরিবার দেড় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ছোট শিশুকে নিয়ে এই কর্মসূচিতে যোগ দেয়।

সম্প্রতি কাশ্মীরের রাওয়ালাকোট ও মিরপুরে পাক বাহিনীর হাতে নিহতদের স্মরণে বিক্ষোভ মিছিলে একটি কফিন বহন করা হয়েছে। কফিনটি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের পতাকায় মোড়ানো ছিল।

মিছিলে আরেকটি বড় ব্যানারে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের মুখ রক্তাক্ত অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। সেখানে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘ফ্যাসিস্ট অব পাকিস্তান’ এবং তাকে ‘পাকিস্তানি হিটলার’ বলে উল্লেখ করা হয়। ব্যানারে ‘নাৎসি স্বস্তিকা চিহ্নও’ ব্যবহার করা হয় এবং উর্দু ভাষায় মুনিরকে হিটলার ও মুসোলিনির সঙ্গে তুলনা করে আপত্তিকর মন্তব্য লেখা ছিল।

কাশ্মীর টাইমস বলছে, এদিন অন্তত ৬০০ নারী হাইড পার্কের স্পিকার্স কর্নার থেকে পাকিস্তান হাইকমিশন পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার পদযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেকের কোলেই ছিল শিশু। তাদের হাতে ছিল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড।

‘মায়ের শেষ কথা ছিল- চারদিকে শুধু রক্ত’

রাওয়ালাকোটের বাসিন্দা এবং বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী লুবনা বলেন, এই বিক্ষোভে অংশ নেয়া তার কাছে দায়িত্বের বিষয়। তার ভাষায়, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আমাদের মানুষ শহীদ হচ্ছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। শেষবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘চারদিকে রক্ত।’ তারপর আর কোনো খবর পাইনি। বাবা-মা এবং স্বজনদের কথা ভেবে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারছি না।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, ইসলামাবাদ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সমর্থকদের ওপর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালাচ্ছে। আহতদের সাদা পতাকা নিয়ে সরিয়ে নেয়ার সময়ও হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

রাওয়ালাকোটের আরেক বাসিন্দা জাহিদা বেগম বলেন, তার ছেলে ও নাতি-নাতনিরা শহরে আটকা পড়েছেন।

তিনি বলেন, তাদের কাছে আর খাবার নেই। পুরো পিএজেকে’তে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎও নেই। ফ্রিজে যা ছিল সব নষ্ট হয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারের সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারছি না। আমি তাদের জন্যই এখানে এসেছি।

রাওয়ালাকোটের আরেক বাসিন্দা নাসরিন খান বলেন, আমি আমার কাশ্মীরি জনগণের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। তিনি কাশ্মীরের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

বিয়ের মৌসুমে নেমে এসেছে শোক

বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা বিয়ের মৌসুমে এই সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। মিছিলে প্রদর্শিত কিছু মোবাইল ভিডিওতে বাড়িতে সেনাদের অভিযান, দোকানপাটে লুটপাট এবং মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।

এক নারী বলেন, বিয়ের প্রস্তুতি নেয়া অনেক পরিবারের গয়না ও নগদ অর্থ কেড়ে নেয়া হয়েছে। মূল্যবান কিছু না পেলে বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া নারীদের শ্লীলতাহানি এবং অশালীন ভাষায় হয়রানির অভিযোগও তোলেন তিনি।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, রাওয়ালাকোটে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা এক ব্যক্তির জানাজাও সেনাবাহিনী করতে দেয়নি।

এদিন মিছিলে অংশ নেয়া ২০ মাস বয়সী জারানও ছিল তার বাবার কাঁধে। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সে প্রায় তিন সপ্তাহ রাওয়ালাকোটে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। পরে বৃটেনে ফিরে এলেও তার পরিবার ৭০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ব্যবসা বন্ধ রেখে বিক্ষোভে অংশ নেয়।

লন্ডনের ওই বিক্ষোভে চার প্রজন্মের পরিবারকে একসঙ্গে হাঁটতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে কেউ পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে জন্মেছেন, কেউ বৃটেনে।
এক তরুণ বলেন, প্রথম হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পাকিস্তানের অংশে এমন কিছু ঘটতে পারে, কখনো ভাবিনি। এছাড়া বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন বৃটিশ-কাশ্মীরি রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী ও কবি এরশাদ মালিক।

তিনি বলেন, যদি পাকিস্তানের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী কাশ্মীর অ্যাকশন কমিটি ‘ভারতপন্থি’ হয় এবং যদি আজাদ কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ সেই কমিটিকে সমর্থন করে, তাহলে সেটি কি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রকাশ নয়? যদি তাই হয়, তাহলে একদিকে গণভোটের দাবি জানিয়ে অন্যদিকে সেই জনগণকেই ‘ভারতপন্থি’ বলা কেন?

তিনি আরও বলেন, ভারতও ধারাবাহিকভাবে দাবি করে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর আইনগতভাবে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি সেটাই ভারতের অবস্থান হয়, তাহলে ওই অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় ভারত কেন প্রায় নীরব? যদি তারা ভারতের নাগরিক হয়, তবে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়েও কি সমান উদ্বেগ থাকা উচিত নয়?

এদিনের বিক্ষোভের আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বৃটেনে পাকিস্তান-শাসিত পশ্চিম কাশ্মীরের বংশোদ্ভূত প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাশ্মীরি প্রবাসী সম্প্রদায়।

এক বিক্ষোভকারী বলেন, আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারছি না। নারীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। সবাই আতঙ্কে আছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পাক নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের ঘটনায় দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক ইসাবেল লাসে বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটিকে নিষিদ্ধ করার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাকে প্রাণঘাতী সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও অস্থিরতার সময় সব মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

তবে বিক্ষোভকারীদের মতে, কেবল বিবৃতি যথেষ্ট নয়। এক বিক্ষোভকারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কাশ্মীরিদের রক্ত রাস্তায় ঝরছে। পৃথিবী জাগার আগে আর কত মানুষকে মরতে হবে?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন