রাজধানী ঢাকার পাশের শিল্পনগরী গাজীপুর এবারো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে আলোচনায়। জেলার পাঁচটি আসনেই ভোটের সমীকরণ সহজ নয়। কোথাও অনেক বেশি ভোটার সংখ্যা, কোথাও শ্রমিক ভোট, কোথাও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, আবার কোথাও দলীয় রাজনীতির ভাঙাগড়া নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এবারের নির্বাচনে গাজীপুর জেলার পাঁচটি আসনে মোট ৪২ জন প্রার্থী রয়েছেন। গাজীপুরের রাজনৈতিক মাঠে জেলার ৫টি আসনের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় গাজীপুর-১ ও গাজীপুর-২ আসন। শহর ও গ্রামের ভিন্ন বাস্তবতা, বিপুল ভোটারের হিসাব আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুই আসনেই লড়াই জমে উঠেছে। উন্নয়ন জোরদার, যানজট নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নাগরিক সেবা সহজ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রার্থীরা ভোটারদের দোরগোড়ায় যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি আর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার বিচারে কার দিকে ভোটাররা ঝুঁকবেন, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। এর মধ্যে গাজীপুর-২ ও ৩ আসনে প্রার্থী রয়েছেন মোট ২০ জন। গাজীপুর-১: শহর বনাম গ্রাম সমীকরণ কালিয়াকৈর ও সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর, কোনাবাড়ি, বাসন এই তিনটি থানার শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকার এই আসনে শিল্পকারখানার শ্রমিক ভোট বড় শক্তি। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যিনি শ্রমিকদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন। এর আগে বারবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এবং ২০ বছর ধরে জনপ্রতিনিধি থাকার সুবাদে বিশেষভাবে পরিচিত ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি’র প্রার্থী। জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন সাবেক সচিব। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এখানে দলীয় ভোটের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বড় ফ্যাক্টর। প্রতিকূল অবস্থায়ও বারবার নির্বাচনে জেতার খেলোয়াড় বিএনপি’র প্রার্থীর সঙ্গে রয়েছেন প্রথমবারের মতো নির্বাচনে দাঁড়ানো জামায়াতের প্রার্থী। শেষ মুহূর্তে নিরপেক্ষ ভোটার কোন দিকে যায়, সেটিই ফল নির্ধারণ করতে পারে। বিএনপি’র প্রার্থী মাঠে প্রচারে নেমে আলো তুলেছেন। যদিও এখানকার কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে নির্বাচনী মাঠে কম দেখা গেছে। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন- মো. মজিবুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ)। মো. শাহ আলম বকশী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (দাঁড়িপাল্লা)। মাওলানা জি এম রুহুল আমিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা)। চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ লেবার পার্টি (আনারস)। তাসলিমা আক্তার, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল‑মার্কসিস্ট (কাঁচি)। মো. ইমারাত হোসেন আরিফ, স্বতন্ত্র (মোটরসাইকেল)। আতিকুল ইসলাম গণফ্রন্ট (মাছ)। এস এম শফিকুল ইসলাম জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল)। গাজীপুর-২: বেশি ভোটার, কম লড়াই দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটারের আসন এটি। গাজীপুর জেলা শহর ও ঢাকার পাশের টঙ্গীর এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসন। আট লক্ষাধিক ভোটারের এই আসন জেলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এখানে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের এনসিপি’র শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। সাংগঠনিকভাবে এই আসনে বিএনপি একাট্টা থাকায় প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেকটাই সুবিধাজনক রয়েছে ধানের শীষ। এ ছাড়া ধানের শীষের প্রার্থীর প্রয়াত পিতা অধ্যাপক এম এ মান্নানের ইমেজ আর তার রেখে যাওয়া ভোট ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় রয়েছেন বিএনপি’র প্রার্থী। দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটে বিজয়ী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচনী মাঠে আওয়াজ তুলছেন ধানের শীষের প্রার্থী। অন্যদিকে, এনসিপি প্রার্থীর দাবি, এবার গণজোয়ার তার পক্ষে, ১১ দলীয় জোটের পক্ষে। গাজীপুর‑২ আসনে প্রার্থীরা হলেন- এম. মঞ্জুরুল করিম রনি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ধানের শীষ)। আলী নাসের খান, জাতীয় নাগরিক পার্টি (শাপলা কুঁড়ি)। হানিফ সরকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা)। মো. জিয়াউল কবির, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (কাস্তে)। মাসুদ রেজা, সমাজতান্ত্রিক দল‑মার্কসিস্ট (কাঁচি)। সরকার তাসলিমা আফরোজ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ (আপেল)। মো. মাহবুব আলম, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল)। মো. আব্দুল কাইয়ুম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই)। জিত বড়ুয়া, স্বতন্ত্র (ফুটবল)। আতিকুল গণফ্রন্ট (মাছ)। মাহফুজুর রহমান, গণঅধিকার (ট্রাক)। শরিফুল ইসলাম জনতার দল (কলম)। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ভোটার উপস্থিতি, তরুণ ও নারী ভোট, শ্রমিক ভোট এবং প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের সংগঠন এই বিষয়গুলো ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার প্রবেশ মুখ কালিয়াকৈর উপজেলা, শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা সিটি করপোরেশনের কাশিমপুর, কোনাবাড়ী ও বাসন এলাকার গাজীপুর-১ আসন এবং শিল্প সমৃদ্ধ টঙ্গী-গাজীপুর এলাকার গাজীপুর-২ আসনে জয়- পরাজয় শুধু এলাকার উন্নয়ন- অগ্রগতি নয়, আগা দেশের রাজনীতির জন্যও একটা বিশেষ বার্তা বহন করবে। জেলার ৫টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা- ২৭,৩৮,২৪৯। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩,৬৪,৩৪৮, মহিলা ভোটার ১৩,৭৩,৮৬৭ ও হিজড়া ভোটার ৩৪। এর মধ্যে মোট পোস্টাল ভোটার-২২,৯১১। জেলায় মোট কেন্দ্র সংখ্যা ৯৩৫টি। গাজীপুর-১ আসনে মোট ভোটার-৭,২০,৯৩৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩,৬০, ২৩৫, মহিলা ভোটার ৩,৬০,৬৯০ ও হিজড়া ভোটার ১২। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটার ৪,৪৪৫। মোট ভোট কেন্দ্র-২৩৭টি। গাজীপুর-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৮,০৪,৩৩৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪,০০,৪০১, মহিলা ভোটার ৪,০৩,৯১৯ ও হিজড়া ভোটার ১৩। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটার- ৫,২৩৪। এই আসনে ভোট কেন্দ্র ২৭২টি। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে গাজীপুরে একক কোনো ইস্যু নয়, বরং এলাকা ও আসনভেদে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা কাজ করছে।
গাজীপুর-১ ও ২ আসনের ২০ প্রার্থীর ভোটের অঙ্ক
ইকবাল আহমদ সরকার, গাজীপুর থেকে
১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
