নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-পাকিস্তান

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন

নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-পাকিস্তান

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় নতুন করে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই দুই দেশের অর্থনীতির সুরক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের নতুন ধাক্কা খুব দ্রুতই খাদ্য, পরিবহন ও বিদ্যুতের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
দুই দেশই জ্বালানি তেলের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইএসএসইসি বিজনেস স্কুল এশিয়া-প্যাসিফিকের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক জামুস লিম বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
তার ভাষায়, এই দুই দেশের জ্বালানি মজুত সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব খুব দ্রুতই অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়বে।

ইতোমধ্যে তেলের বাজারে সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। জুলাই মাস শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মার্চের পর সবচেয়ে বড় মাসিক উল্লম্ফনের পথে রয়েছে।
১ জুলাই যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ছিল ৭০ দশমিক ১৮ ডলার, শুক্রবার (৩১ জুলাই) এশিয়ার লেনদেনে তা বেড়ে ৮৪ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে- অর্থাৎ প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি।
একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় একই হারে বেড়ে ৮১ দশমিক ৮৪ ডলার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের কারণে ঝুঁকি এখন শুধু হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই।

গত বুধবার মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার পর সুয়েজ খাল-সংলগ্ন নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। এই পথটি সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।

ঋণের বোঝা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সমর্থিত সংস্কার কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সরকারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আগেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে দুই দেশের মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, ভর্তুকি দেয়া কঠিন হবে এবং সরকারি অর্থনীতিও আরও সংকুচিত হবে।

যদি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পঞ্চম মাসে গড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার বিষয়েও বিবেচনা করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, পাকিস্তান, মিশর, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং উচ্চ ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক উদীয়মান বাজার বিভাগের প্রধান গ্যাব্রিয়েল স্টার্ন এবং জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ইভজেনিয়া স্লেপসোভা বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে এসব দেশের ঋণ পরিশোধ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তাদের মতে, মোজাম্বিক, পাকিস্তান, কেনিয়া, ঘানা ও তিউনিসিয়া- যাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক কম- সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

স্লেপসোভা বলেন, যদি হরমুজ প্রণালি ২০২৭ সাল পর্যন্ত আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ঋণ গ্রহণের ব্যয় আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি।

অধ্যাপক জামুস লিম বলেন, সাধারণত দেশগুলো আইএমএফের ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাংলাদেশকে আইএমএফের সঙ্গে অতিরিক্ত ছাড় বা পুনঃআলোচনায় যেতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়।

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছেন, প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।

বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি পাকিস্তানকে এখন কূটনৈতিকভাবেও জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।

একদিকে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করছে।
সম্প্রতি কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ ইসলামাবাদ সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে দুই দেশ পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকরের বিষয়েও আলোচনা করে।

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছিল।

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, পাকিস্তান তুলনামূলক কম খরচে সামরিক প্রশিক্ষণ, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সহায়তা দিতে পারে।

তবে তিনি বলেন, পাকিস্তান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বিকল্প হতে পারবে না। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়াতে বা দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তাই তাদের ভূমিকা সীমিত ও বাস্তবমুখীই থাকবে।”
ইন্ডিক রিসার্চার্স ফোরামের কৌশলগত সম্পৃক্ততা ও অংশীদারিত্ব বিভাগের পরিচালক শ্রীনিবাসন বালাকৃষ্ণন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পাকিস্তানের স্বার্থে নয়।

তার মতে, এতে ইসলামাবাদকে একযোগে ওয়াশিংটন, তেহরান, বেইজিং এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজধানীর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশীয় জ্বালানি সংকট এবং ইরান সীমান্ত ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি পাকিস্তানের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন