পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িসহ আশপাশের অঞ্চলের প্রায় ৯ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল ‘খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল’। খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলা এবং সীমান্তবেষ্টিত দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালির স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল এই হাসপাতাল। তবে বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার এই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হাসপাতালটি নিজেই যেন এক জটিল ‘রোগী’তে পরিণত হয়েছে। একদিকে চিকিৎসক পদের সিংহভাগ খালি, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়ে আছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসকদের মোট ৮০টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে ৬৫টি পদই বর্তমানে খালি পড়ে আছে।
অর্থাৎ, মাত্র ১৫ জন চিকিৎসক দিয়ে সামাল দেয়া হচ্ছে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের বিশাল চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও নীতি-নির্ধারণী পদ ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ও ‘সহকারী পরিচালক’ উভয় পদই দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন অবস্থায় শূন্য রয়েছে। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদগুলোতে। সিনিয়র কনসালটেন্টের ৯টি পদের মধ্যে ৭টিই শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। জুনিয়র কনসালটেন্টের ১৫টি পদের ১৩টি খালি রেখে মাত্র ২ জন চিকিৎসক দিয়ে কোনোমতে বিভাগগুলো সচল রাখা হয়েছে। তদুপরি, জটিল ও আশঙ্কাজনক রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ৪টি ‘এনেস্থেশিয়া’ পদের ৪টির সবক’টিই শূন্য থাকায় এখানে জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৮টি পদের ৬টি খালি, কর্মরত মাত্র ২ জন।
আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে সরাসরি চিকিৎসা প্রদানে নিবেদিত সহকারী সার্জনের ২২টি পদের মধ্যে ২১টিই শূন্য পড়ে আছে। পুরো জেলা হাসপাতালের সহকারী সার্জনের বিশাল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র ১ জন চিকিৎসক। পাশাপাশি সহকারী সার্জন/ইকুইভ্যালেন্ট ৬টির মধ্যে ৩টি এবং সহকারী রেজিস্টারের ৯টির মধ্যে ৮টি পদই শূন্য। এদিকে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও বাস্তবে রোগী মিলছে ১০০ শয্যার প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোর সুবিধায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দীঘিনালার উপজেলার চৌংড়াছড়ি এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর শুনতে হলো প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। পাহাড়ি অঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের বাধ্য হয়েই সদরের প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে। বাঘাইছড়ি থেকে আসা স্বাগতা চাকমা আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমার মেয়ের একটা ছোট অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
কিন্তু এখানে এনেস্থেশিয়ার কোনো ডাক্তার না থাকায় অপারেশন করতে বিলম্ব হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সেবা প্রদানকারীদের ওপর সৃষ্টি হওয়া মানসিক চাপ সম্পর্কে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) রিপেল বাপ্পি চাকমা বলেন, আমরা ১০০ শয্যার অপ্রতুল সাধ্য দিয়েই দৈনিক হাজারো রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশেষজ্ঞসহ অধিকাংশ পোস্ট খালি থাকার কারণে ডিউটিতে থাকা অল্পসংখ্যক চিকিৎসককে অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন রতন খীসা বলেন, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে হাসপাতালের ভবন নির্মাণ ঝুলে থাকা এবং চিকিৎসকদের সিংহভাগ পদ শূন্য থাকায় আমরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা দিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। আশা করছি ঊর্ধ্বতন বিভাগ দ্রুততম সময়ে এ সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
