গাজায় দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি যুগান্তকারী চুক্তিতে পৌঁছেছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গঠিত ‘গাজা বোর্ড অব পিস’ বিষয়টি নিশ্চিত করে। এই চুক্তির আওতায় হামাস গাজায় তাদের অস্ত্র পর্যায়ক্রমে সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে গাজা উপত্যকা থেকে ক্রমান্বয়ে সেনা প্রত্যাহার করবে ইসরাইল। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই চুক্তির রোডম্যাপ অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ২৮০৩-এর আলোকে আগামী ১৪ দিনের মধ্যে গাজায় থাকা সমস্ত অস্ত্রের একটি সবিস্তার তালিকা প্রস্তুত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার শুরুতে মূলত ভারী অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক উৎপাদনের স্থান, অস্ত্রের গুদাম এবং গাজার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত, নিষ্ক্রিয় ও তালিকাভুক্ত করা হবে। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণে গঠিত একটি নতুন ‘জাতীয় প্রশাসনিক কমিটি’ অস্ত্র জমা ও সংরক্ষণের পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তদারক করবে।
চুক্তির শর্তানুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই কোনো অস্ত্র ইসরাইল বা অন্য কোনো বিদেশি পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে না। গাজার নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ কমিশন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ISF) এবং একটি নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী একযোগে কাজ করবে। এই আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং অস্ত্র জমা দেওয়ার অগ্রগতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে ইসরাইলি বাহিনী গাজার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো থেকে নির্ধারিত রেখায় ধাপে ধাপে পিছিয়ে যাবে।
গাজা বোর্ড অব পিসের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন এবং গাজার পুনর্গঠন ও ফিলিস্তিনিদের নিজেদের দ্বারা পরিচালিত একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল নিয়ে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র সংশয় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।
গাজা সিটির স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে যতই বড় বড় সমঝোতার কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে তারা এখনো প্রতিদিনের ভয় ও সহিংসতার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, হামাসের আলোচনাকারী দলের সদস্য গাজী হামাদ খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসরাইল যদি চুক্তির কোনো শর্ত পালনে গড়িমসি করে বা লঙ্ঘন করে, তবে হামাসও এই চুক্তির কোনো ধাপ বাস্তবায়ন করবে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক মনে করলেও, ইসরাইল শেষ পর্যন্ত এই চুক্তির প্রতি পূর্ণ আনুগত্য বজায় রাখবে কি না এবং মার্কিন প্রশাসন এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে, দুই শতাধিক দিনের বেশি সময় ধরে চলা এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়ন এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের কড়া আন্তর্জাতিক নজরদারির ওপর।
