পাকিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরেই সংকটাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়। তবে দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, দেশটি এখন আর একক কোনো সংকটের মুখোমুখি নয়; বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক চরমপন্থা এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর অসন্তোষ- সবকিছু একই সময়ে বিস্ফোরিত হয়েছে।
এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তান কার্যত সংঘাতের মাঠে পরিণত হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়া এখনো সশস্ত্র বিদ্রোহ ও জঙ্গিবাদের চক্রে আটকে আছে। এরই মধ্যে দীর্ঘদিন পাকিস্তানের কাশ্মীর নীতির ‘সফল মডেল’ হিসেবে তুলে ধরা ইসলামাবাদ-শাসিত কাশ্মীরেও (পিওকে) বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পিওকের চলমান বিক্ষোভ ইসলামাবাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, প্রতিটি বিক্ষোভ শুধু অঞ্চলটির ওপর পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকেই দুর্বল করছে না, বরং কাশ্মীরিদের একমাত্র প্রতিনিধিত্ব করার পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বহু বছর ধরে বিশেষ করে মিরপুর অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক কাশ্মীর প্রচারণার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিলেন। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী মিরপুরি প্রবাসীরাও বৃটিশ রাজনীতি ও গণমাধ্যমে পাকিস্তানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ কারণেই পিওকে’তে আন্দোলনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই আন্দোলনকে আদর্শগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ করে ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী বা ভারতপন্থী হয়ে যাননি।
বরং তাদের মধ্যে ক্রমশ এই ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে যে, পাঞ্জাব প্রভাবিত পাকিস্তানি রাষ্ট্রে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের আশঙ্কা, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তারা বেলুচ ও পশতুনদের মতোই উপেক্ষিত এবং কার্যত একটি উপনিবেশের বাসিন্দায় পরিণত হয়েছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ক্ষোভ রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর রাজনৈতিক বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক অবহেলার ফলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সম্পদের বড় অংশ পাঞ্জাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অন্য অঞ্চলগুলোকে বরাবরই তুলনামূলক কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সীমিত সুবিধাও কমে যায়। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় মানুষের ক্ষোভ রাস্তায় নেমে আসে। অর্থনৈতিক দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পিওকের মানুষের মধ্যে পাকিস্তানের কাশ্মীর-সংক্রান্ত প্রচারণার ওপরও আস্থা কমছে। তাদের উপলব্ধি, তথাকথিত “আজাদ কাশ্মীর”-এর প্রকৃত ক্ষমতা মুজাফফরাবাদের হাতে নয়, ইসলামাবাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের সামরিক বা কূটনৈতিক সক্ষমতা বাস্তবতা পরিবর্তনের মতো শক্তিশালী নয় বলেও তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) অপর পাশে ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের অর্থনৈতিক উন্নয়নও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রচারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পাকিস্তান কিছুটা কূটনৈতিক গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পাকিস্তান বহুবার সাময়িক ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে স্থায়ী জাতীয় শক্তি বলে ভুল করেছে।
বিশ্লেষণে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা কিংবা আফগান জিহাদ ও ৯/১১–পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। বরং উগ্রবাদ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক জন আর. শ্মিটের ‘দ্য আনরাভেলিং: পাকিস্তান ইন দ্য এজ অব জিহাদ’ এবং বাবর আইয়াজের ‘হোয়াটস রং উইথ পাকিস্তান?’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তান শুরু থেকেই প্রকৃত অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি।
বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ক্রমেই পাঞ্জাবকেন্দ্রিক অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং এখন পিওকের অস্থিরতা- সবই একই কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
দেশটির সেনাবাহিনীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রভাব রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করেছে। সরাসরি সামরিক শাসন কিংবা সেনাবাহিনীর প্রভাবাধীন বেসামরিক সরকার- উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিরোধের সমাধানে আলোচনার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে প্রায়ই ‘রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য’ অথবা ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’- এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখে। ফলে সমঝোতার সুযোগ সংকুচিত হয়।
বিশ্লেষণে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাজনৈতিক উত্থান ও পতনের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকাকালে ইমরান খান ক্ষমতায় উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু সেই সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর তিনি ক্ষমতা হারান এবং পরে কারাবন্দি হন।
অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দেশটির সেনাপ্রধান (বর্তমানে ফিল্ড মার্শাল) আসিম মুনিরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়েছে, পাকিস্তান নিজেকে মুসলমানদের আবাসভূমি ও ইসলামের দুর্গ হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে রাষ্ট্রটি ক্রমেই পাঞ্জাবকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পাকিস্তান এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যাকে অনেকেই “পাঞ্জাবিস্তান” নামে অভিহিত করবেন বলে বিশ্লেষণে মন্তব্য করা হয়েছে।
লেখা: ফার্স্টপোস্ট (ইংরেজি থেকে অনূদিত)
