ময়মনসিংহের ভালুকায় বিএনপি’র রাজনীতিতে চলছে অশনিসংকেত। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে ঘটতে পারে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা। ঘটনার অন্তরালে কাজ করছে নানান হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক অঘটন ঘটেই চলেছে। জানা যায়, ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দু’গ্রুপের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। গ্রুপিংয়ের কারণে ভালুকায় বাবাকে লক্ষ্য করে ছেলের গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে। ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনের এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ এবং ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ভালুকা উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ।
বাচ্চুকে দু’বার শোকজ নোটিশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৮ই জুলাই এমপি বাচ্চুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এরআগে, একবার বহিষ্কারও হয়েছিলেন তিনি। এর দু’বছরের মাথায় আবারো তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলো দল। ১৮ই জুলাই বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এড. রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত নোটিশে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া, ’২৪-এর ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে বাচ্চুকে গত ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কৃত অপরাধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আবেদন করার প্রেক্ষিতে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওই বহিষ্কারাদেশ ২০২৫ সালের ২৪শে অক্টোবর প্রত্যাহার করে তার প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ আগেও তিনি একই অপরাধে বহিষ্কার হয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ২২ বছর ধরে মোর্শেদ আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এইচআরকেএম এন্টারপ্রাইজের নামে বৈধভাবে ওয়ার্ক অর্ডার নিয়ে ওই কারখানার জমি কেনবেচা, কনস্ট্রাকশন, সাপ্লাই ও ঝুটের ব্যবসা করে আসছে উপজেলার জামির দিয়া এলাকার এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার পোষ্য লোকজন মোর্শেদ আলমের ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে। ঝুট ব্যবসা হাতিয়ে নিতে ১৭ই মার্চ ইব্রাহিম খলিলকে বাদী সাজিয়ে মোর্শেদ আলমসহ ৫০ বিএনপি’র নেতাকর্মীকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ১৬ই এপ্রিল খোকা মিয়াকে বাদী সাজিয়ে এমপি বাচ্চুর প্রভাবে মোর্শেদ আলমকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় আরেকটি মামলা করা হয়।
মোর্শেদ আলম বলেন, বাচ্চুর নির্দেশে মিথ্যা মামলায় আসামি করে তার কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দেয়া হচ্ছে। তার দাবি, বাচ্চু এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। স্থানীয়রা জানান, বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে নিহত তোফাজ্জল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যুবলীগ নেতা খলিলুর রহমান মাসুদ ও আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান মতি মেম্বারসহ মো. সোহাগ মিয়া, খোকা মিয়া ও ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। বাচ্চুর প্রতিনিধি হিসেবে হবিরবাড়ী এলাকার মিল কারখানার ঝুট ব্যবসা এরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। জানা যায়, গত ৯ই জুলাই জামির দিয়ায় এনভয় টেক্সটাইল মিলের প্রধান ফটকের সামনে থেকে কেমিক্যালের ব্যবহৃত খালি ড্রাম বহনকারী একটি ট্রাক ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল এবং হবিরবাড়ী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. সোহাগ মিয়ার নেতৃত্বে ছিনতাই হয়। পরে শিল্প পুলিশের সহায়তায় ট্রাকটি উদ্ধারও হয়।
এ ঘটনায় গত ১১ই জুলাই শিল্পপুলিশ, ময়মনসিংহ-৫, এর পুলিশ সুপার বরাবর মিলের ডিজিএম মো. সারোয়ার হোসেন একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, ইব্রাহিম খলিল ও সোহাগ মিয়া ফ্যাক্টরি থেকে ওয়েস্টেজ বা ঝুট মালপত্র বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়া, স্টোন চিপসহ অন্যান্য সামগ্রী বহনকারী গাড়ি কারখানায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এর ফলে এনভয় টেক্সটাইলসের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
ভালুকা পৌর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিএনপি করেও আমরা এখন আওয়ামী লীগের আমলের চেয়ে খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। এমপি বাচ্চুর সমর্থিত ব্যক্তিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা কোণঠাসা। সাবেক এমপি আমানউল্লাহ চৌধুরীর ভাতিজা সাইফুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপি’র ত্যাগী নেতাকর্মীরা সকল কিছু সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাচ্চুর ড্রাইভার সুমন ও কামাল যৌথভাবে আমার জমির সীমানা খুঁটি ও সাইনবোর্ড তুলে নিয়ে গেছে।
ভালুকা উপজেলা বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমীন বলেন, এমপি বাচ্চুর লোকজন বিএনপিকে দু’গ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য ঝুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু দাবি করেন, ওই মামলাগুলোতে তার কোনো ইন্ধন নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রেষারেষী।
