সাতক্ষীরা জেলায় বর্তমানে প্রায় ৭৫ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রচলিত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিপুল মামলার জট নিরসনে বিদ্যমান বিচারকের সংখ্যার চেয়ে ১০গুণ বেশি বিচারক নিয়োগ দিলেও কাঙ্ক্ষিত সময় এসব মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব হবে না। তাই আদালতের মামলা জট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) কার্যক্রমের মাধ্যমে আপসযোগ্য মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাসিক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বলেন, আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এ অবস্থায় শুধু বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে কাঙ্ক্ষিত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল, সময়োপযোগী ও জনবান্ধব করতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, আপসযোগ্য মামলাগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিষ্পত্তি করা গেলে শুধু একটি মামলারই অবসান ঘটে না, বরং দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ, তিক্ততা ও সামাজিক দূরত্বও দূর হয়। এতে পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি আদালতের উপর মামলার চাপও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত, সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে সরকার জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে বেশ কয়েক ধরনের মামলা আদালতে দায়েরের আগে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আপসের উদ্যোগ গ্রহণের বিধান রয়েছে। এ উদ্যোগ সফল করতে বিচার বিভাগ, আইনজীবী, প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বায়ক এডভোকেট বিএম মিজানুর রহমান পিন্টু। এ ছাড়াও বক্তব্য দেন- অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস, পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, জেলা তথ্য কর্মকর্তা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি শেখ আলমগীর আশরাফ, প্যানেল আইনজীবী খায়রুল বদিউজ্জামান, এডভোকেট মুহাম্মদ মুনিরউদ্দিন, এডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন লিমা, এডভোকেট নাজমুন নাহার ঝুমুর, এডভোকেট মো. জিয়াউর রহমান, এডভোকেট আকরাম আলীসহ অন্যরা। সভায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন সংশোধন-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
এ ছাড়া, বিভিন্ন আইনে আপসযোগ্য মামলার পরিধি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো এবং আপসের কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ নয়ন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোস্তাফিজুর রহমান। সভায় বক্তারা বলেন, আদালতের মামলা জট নিরসন, বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সভায় উপস্থিত ছিলেন- সাতক্ষীরা বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক, জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির প্যানেল আইনজীবী এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।
