জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণমাধ্যম ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জ্বল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহাবুল হকের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-এর মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণমাধ্যম সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা এমপি, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহবায়ক ও সাবেক মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সদস্য জিমি আমির ও চ্যানেল২৪-এর অ্যাসাইনমেন্ট ইডিটর মাকসুদ-উন নবী।
মূল প্রবন্ধে ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন গণমাধ্যমের উপর গণমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজন মনস্তত্বের পরিবর্তন। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। ব্যক্তি হিসেবে আপনি কোন রাজনৈতিক দল অথবা কোন ফুটবল দলের সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে আপনি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করবেন এই বোধ ফিরিয়ে আনা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, জুলাইয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি, তাই এটিকে বিপ্লব বলা যাচ্ছে না। মানুষের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও সেই কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। গণমাধ্যমের সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। এর সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থা ও করপোরেট মালিকানার প্রভাবও যুক্ত হয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে দুর্বল করেছে। তিনি বলেন, অনেক মালিক গণমাধ্যমকে জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নিজেদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা এমপি বলেন, বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে গণমাধ্যম। রাষ্ট্র, নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কারও টেকসই হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ প্রসঙ্গে মাহমুদা হাবিবা বলেন, অনেক সাংবাদিক এখনও অনিশ্চিত চাকরি ও অপ্রতুল বেতনে কাজ করছেন। মালিকপক্ষের অযৌক্তিক চাপ মোকাবিলা করতে তাদের আইনি সুরক্ষা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিগত সরকারের সময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৮ সালে নিখোঁজ হওয়ার পরও অনেক গণমাধ্যম ভয়ের কারণে ঘটনাটিকে সরাসরি তুলে ধরতে পারেনি। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, এজন্য তিনি তাদের প্রতি সম্মান জানান। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক দল, সরকার ও গণমাধ্যমকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, এমপি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং জনগণও এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাই এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বা অযথা বিলম্ব সৃষ্টি হলে তা কেবল রাজনৈতিক সংকটই নয়, বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কারের নামে নতুন করে আলোচনা শুরু করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। অথচ জনগণ জানতে চায়, কবে সনদ বাস্তবায়িত হবে এবং কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ উঠছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের মতো দীর্ঘদিনের সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়নি।
সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জিমি আমির বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তিনি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ছাত্রদের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, তারা কেবল আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যম ঘটনাটিকে ‘ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ’ হিসেবে প্রচার করেছে। তিনি বলেন, পরবর্তীতে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, সব সিদ্ধান্ত প্রতিবেদকদের হাতে থাকে না। তিনি আরও বলেন, সে সময় এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে ছাত্রদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি রাজি হননি। কারণ হিসেবে ওই সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘পুলিশের বিপক্ষে যাওয়া যাবে না।’ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, কমিশনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে, তাই সেখান থেকে বাধা আসছে। এছাড়া কমিশনের জনমত জরিপের তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেয়ার বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
চ্যানেল২৪-এর অ্যসাইনমেন্ট ইডিটর মাকসুদ-উন-নবী বলেন, এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ওয়াচডগ বা নজরদারির ভূমিকা। কোনো রাজনীতিবিদ বললেন বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, আরেকজন বললেন হচ্ছে না; সাংবাদিকের কাজ শুধু দুই পক্ষের বক্তব্য লেখা নয়; জানালা খুলে দেখে আসা যে সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে কি না। সত্য যাচাই করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) বয়ান গড়ে তোলা। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্য গড়বে কি না, সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু বিভাজন নয়, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি না করে সত্য তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে।
