মৌলভীবাজারে ‘ইভটিজিং কিশোর গ্যাং’ হটস্পট

মৌলভীবাজারে ‘ইভটিজিং কিশোর গ্যাং’ হটস্পট

ফন্ট সাইজ:

প্রশাসনের নাকের ডগায় উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করে শান্ত জেলার বাসিন্দাদের মনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে উঠতি বয়সী একদল কিশোর ও তরুণ। হঠাৎ ওদের এমন উদ্ভট আচরণে বিব্রত প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত চায়ের রাজধানী খ্যাত শান্ত জেলার বাসিন্দারা। সাইলেন্সার-বিহীন প্রাইভেটকার আর মোটরসাইকেলে দ্রুতগতিতে হঠাৎ দলবেঁধে শহরের প্রধান সড়কে ঘোরাঘুরি করে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে জনমনে।

সাম্প্রতিক সময়ে শহরে দিনে অথবা রাতে এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে হরহামেশাই। ওদের এমন আচরণে পথচারী, ব্যবসায়ী, বাসাবাড়িতে বসবাসকারী শিশু ও অসুস্থ বয়স্করা চরম বিব্রত ও বিরক্ত হলেও ওদের থামানোর কেউ নেই যেন। ফলে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এদের সংখ্যা। ভারী হচ্ছে ওদের দল ও গ্রুপ। শহরের বিভিন্ন স্পট ছাড়াও পাড়ায় মহল্লায় বিচরণ বাড়ছে তাদের। আসক্তি বাড়ছে অনলাইন জুয়া, মাদক সেবন ও ক্রয়-বিক্রয়ে। টার্গেট কিলিং, চুরি ও ছিনতাইয়েও যুক্ত হচ্ছে তারা।

তবে সম্প্রতি নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে। এদের থামাতে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে পুলিশ। বলছে কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং, মাদক, চোরাচালানির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি তাদের। জানা যায় পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান ছাড়াও স্কুল ও কলেজগামী অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের অজান্তেই যুক্ত হচ্ছে এমন অপকর্মে। পরিবারের চরম দায়িত্বহীনতায় তারা প্রাইভেট পড়া, কোচিং সেন্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার বাহানায় নানা ছুতায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে মিশছে। অপেক্ষাকৃত কম বয়সের ছেলেদের এমন কর্মকাণ্ড দেখে হতবাক হচ্ছেন শহরের সিনিয়র সিটিজেনরা।

জানা যায় কিশোর গ্যাংয়ের ওই কিশোরদের এমন অপকর্ম ছাড়াও প্রতিনিয়তই ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীরা। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে একশ্রেণির বখাটে ও স্থানীয় স্ট্যান্ডের গাড়ি চালকের দ্বারাও নীরবে সরব চরম ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারীরা।

ভুক্তভোগীরা জানান শহরের কয়েকটি গাড়ি স্ট্যান্ডে যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ কিছু গাড়ি চালকদের ইভটিজিং যেন এটিই অন্যতম আনন্দের কাজ। স্থানটি যেন ইভটিজিংয়ের স্ট্যান্ড। তাই মেয়েরা এই স্থান পাড়ি দেন চরম আতঙ্কে। মৌলভীবাজার চাঁদনীঘাট গাড়ি স্ট্যান্ড। মনু ব্রিজের (চাঁদনীঘাট ব্রিজ) উত্তর পাশ থেকে শুরু হয়ে প্রায় অর্ধকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবৈধ এই গাড়ি স্ট্যান্ড। যৌন হয়রানির শিকার মেয়েদের কাছে ওখানকার পরিচিতি এখন এমনই। ওই স্থানটি নিয়ে মেয়েদের অভিযোগের অন্ত নেই। স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা প্রতিদিনই ওখানে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে প্রতিদিনই তা সহ্য করলেও চরম মানসিক যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত হচ্ছেন। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ ছোট-বড় গাড়িগুলোর চালক ও সহযোগীরাই স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার সময় মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। জেলার ঐতিহ্যবাহী মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, শাহ মোস্তফা কলেজ, কাশিনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইম্পিরিয়াল কলেজ, হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, আলী আমজদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শাহ হেলাল উচ্চ বিদ্যালয় ও মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসা। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিয়ত কয়েক হাজার ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করতে আসে। ওই স্থানগুলো তারা ভয় আর শঙ্কায় পাড়ি দেয়। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী ইভটিজিং স্পটগুলো হলোÑ শহরের বেড়িরপাড় পয়েন্ট, পৌরসভা ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের পূর্বপাশের গাড়ি স্ট্যান্ড, সমশেরনগর রোডের সিএনজি গাড়ি স্ট্যান্ড, কুসুমভাগ পয়েন্টের পশ্চিম পাশের গাড়ি স্ট্যান্ড, এস আর প্লাজার সামনে।

এ ছাড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশ এলাকা ও পৌর মার্কেটের সামনে, আলী আমজাদ ও হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই ইভটিজিং স্পটগুলো ছাড়াও শহরের প্রেস ক্লাব মোড়, বড়হাট, মনুব্যারেজ, শান্তিভাগ ওয়াকওয়ে, কুদালীছড়া ওয়াকওয়ে, শহরের বিভিন্ন মার্কেটের সামনে, ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, বড়কাপন, বেড়িরচর, আব্দুল মালিক উচ্চ বিদ্যালয় স্কুলের মোড়, গোবিন্দশ্রী সড়কের আশপাশ, পৌর ঈদগাহের আশপাশ, বড়হাট নদীর পাড়সহ এ সকল এলাকার প্রবেশদ্বার বা বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে এরা আড্ডা দেয় বলে স্থানীয়রা জানান। জেলা শহরের বাইরে অন্যান্য উপজেলা শহরেরও একই অবস্থা এমনটি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জেলা শহরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা টাকা পেয়ে শহরের পৌরসভা এলাকায় কুপিয়ে খুন করেছিল এডভোকেট সুজন মিয়াকে। এ ছাড়া স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুলাউড়ার শ্রীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাসিফা জান্নাত আঞ্জুমকে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে খুন করে লাশ গুম করে বখাটে ও ইভটিজার প্রতিবেশী জুনেল মিয়া।
জেলা জুড়ে এ রকম ছোট-বড় আরও একাধিক ঘটনাও রয়েছে। ২৭শে জুলাই মৌলভীবাজার শিল্পকলা অডিটোরিয়ামে জেলা পুলিশের উদ্যোগে পুলিশ-নাগরিক মতবিনিময় সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কিশোর গ্যাং, মাদক, চোরাচালানি, ইভটিজিংসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. মো. জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, স্বাগত বক্তা ছিলেন পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম। ওই সভায় এমপি এম নাসের রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিশোর গ্যাংসহ অন্যান্য অপরাধীদের বিষয়ে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন