মাঝপথে হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে খাদ্যের দাম

সিপিডির গবেষণা

মাঝপথে হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে খাদ্যের দাম

ফন্ট সাইজ:

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পণ্যভেদে একাধিক হাতবদল, মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা করায় নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থায় অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ বিপণন কাঠামোর কারণেও পণ্যের দাম চড়া থাকছে। ফলে কৃষক বা উৎপাদকরা সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে চড়া দামে পণ্য কিনে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ ভোক্তার।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এই চিত্র উঠে এসেছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট ফকরুদ্দিন আল কবীর।

গবেষণায় চাল, ডাল, পিয়াজ, আলু, বেগুন, কাঁচামরিচ, ডিম, গরুর মাংস, মাছ ও মুরগিসহ ১০টি প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) বিশ্লেষণ করা হয়। দেশের বিভিন্ন উৎপাদন এলাকা ও ১০টি খুচরা বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়।

হাতবদল ও অতিরিক্ত মার্জিন

উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ফড়িয়া, কমিশন এজেন্ট, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা জড়িত। পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ, যাতায়াতে চাঁদাবাজি, স্টোরেজ ফি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক প্রফিট মার্জিনের কারণে পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়।

আয়ের সিংহভাগই খাবারের পেছনে

প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে নিম্নআয়ের এবং দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট খরচের প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্যদ্রব্য কেনাকাটায় ব্যয় করে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন তারা। পুষ্টিকর খাবার ছাঁটাই করতে বাধ্য হন এসব পরিবারের সদস্যরা। দেশের সবচেয়ে নিম্ন আয়ের ৫% পরিবার তাদের মোট খরচের ৫৯.৮% ব্যয় করে খাদ্যসামগ্রীতে, যেখানে জাতীয় গড় ৪৫.৮%।

এতে বলা হয়, কৃষক পর্যায়ে সঠিক বাজারদরের তথ্য না থাকা এবং খুচরা পর্যায়ে সিন্ডিকেটের প্রভাবে কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি ঘটানো হয়। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণ মূল্যস্ফীতি গত কয়েক বছর ধরে ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল অত্যন্ত বেশি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

সিন্ডিকেট ও বাজারে অসম প্রতিযোগিতা

অনেক ক্ষেত্রে বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার পরিবর্তে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। মজুদদারি ও পাইকারি পর্যায়ে গুটিভেদে কারসাজির কারণে বাজার অস্থিতিশীল থাকে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে খুচরা দামে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা

গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকা বিভাগের নির্বাচিত ১০টি খুচরা বাজার থেকে ব্যাকওয়ার্ড ট্রেসিং বা পেছনের দিকে সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ করে উৎপাদক/কৃষক পর্যায় পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে ৮২০ জন বাজার প্রতিনিধির (কৃষক, ফড়িয়া, বেপারি, আরতদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা) তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, চালের ক্ষেত্রে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে অন্তত ৪ থেকে ৫টি ধাপ পার হতে হয়। প্রতি ধাপে পরিবহন খরচ, অপচয় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচের পাশাপাশি আরতদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্ধারিত কমিশন ভোক্তা পর্যায়ে দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে পেঁয়াজ, আলু ও বেগুনের ক্ষেত্রে পোস্ট-হারভেস্ট লস (ফসল কাটার পরবর্তী অপচয়) এবং কোল্ড স্টোরেজের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বাজারকে অস্থির করে তোলে।

প্রকৃত মজুরি হ্রাস

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছরে নামমাত্র মজুরি কিছুটা বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি সূচক কমেছে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা মার খেয়েছে। খাদ্যের চড়া দাম সামলাতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ও মান কমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও সামাজিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সিপিডি বলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, খামার বা উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হারও তত বেশি। বিশেষ করে কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ, যা বিশ্লেষণ করা পণ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া মাঝারি পাইজাম চালে ১০০ শতাংশ, দেশি পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ডিম, মুরগি, গরুর মাংস ও রুই মাছের মতো তুলনামূলক ছোট সরবরাহ শৃঙ্খলের পণ্যে মূল্যবৃদ্ধির হারও কম।

সেমিনারে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘শুধু উৎপাদন বাড়ানো বা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর দোষ না চাপিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে।’

সিপিডির সুপারিশ

কৃষক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ: মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে কৃষক সমবায় ও সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা।
বাজার মনিটরিং ও আইনি ব্যবস্থা: প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় করে অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
পরিবহন ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা: পচনশীল পণ্যের অপচয় কমাতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
স্বচ্ছ ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা: প্রতিদিনের পাইকারি ও খুচরা বাজারের দর প্রকাশ্যে প্রদর্শনের মাধ্যমে বাজার সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

বক্তারা মনে করে, কেবল সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কার্যকর বাজার তদারকির মাধ্যমেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া সম্ভব।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এছাড়া সিপিডির গবেষণা সহযোগী আফরিন মাহবুব, সানজানা খন্দকার ও সাদিয়া আফরিন এবং কর্মসূচি সহযোগী আয়েশা সুহাইমা রব উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন