জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের সাক্ষ্য

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের সাক্ষ্য

ফন্ট সাইজ:

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক। বৃহস্পতিবার তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেন। সাক্ষ্যে মনিরুল হক বলেন, তিনি ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ২০১৭ সালে অবসরে যান। ২০০৮ সালের শেষ দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি র‍্যাব-৮ বরিশালের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এ সময় র‍্যাব সদর দপ্তরের নিয়মিত কমান্ডার সম্মেলনে অংশ নিতেন, যেখানে র‍্যাবের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং বিভিন্ন শাখার পরিচালকরা উপস্থিত থাকতেন। তিনি দাবি করেন, তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান বৈঠকে গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিষয়ে ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিতেন। একই সঙ্গে র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জিয়াউল আহসান বিভিন্ন অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দিতেন এবং ব্যাটালিয়নের কাছ থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতেন।

মনিরুল হক আদালতে বলেন, ভোলা ও সুন্দরবন এলাকায় পরিচালিত একাধিক অভিযানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এসব অভিযানের পর গুলিবিদ্ধ কয়েকজনের মরদেহ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও তার কাছে ঘটনাগুলো পরিকল্পিত বলে মনে হয়েছে। তার ভাষ্য, নিহতদের আগেই হত্যা করে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়েছিল বলে তার ধারণা।

এ বিষয়ে তিনি দুটি স্থিরচিত্রও ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন, যা আদালত বস্তু প্রদর্শনী হিসেবে গ্রহণ করে (ডিফেন্সের আপত্তিসহ)। সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের রাজু ডাকাতবিরোধী অভিযান এবং নিশানখালী এলাকার আরেকটি যৌথ অভিযানে জিয়াউল আহসান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস), মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ওই দুই অভিযানের পরও কয়েকটি মরদেহ ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। তার দাবি, এসব ক্ষেত্রেও ঘটনাগুলো পূর্বপরিকল্পিত বলে তার কাছে মনে হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাথরঘাটা এলাকায় পরিচালিত একটি গোপন অভিযানের বর্ণনা দেন। তার দাবি, গভীর রাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে চোখ ও হাত বাঁধা কয়েকজন ব্যক্তিকে র‍্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আনা হয়।

পরে তাদের একটি নৌকায় তুলে সমুদ্র মোহনার দিকে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘নৌকার ছাদ থেকে নিচে তাকিয়ে তিনি দেখেন, একজন ব্যক্তির শরীরে ভারী বস্তা বেঁধে তাকে গুলি করা হয় এবং পরে পেটে ছুরিকাঘাত করে পানিতে ফেলে দেয়া হয়।’ এরপর আরও কয়েক দফা গুলির শব্দ এবং পানিতে দেহ ফেলে দেয়ার শব্দ তিনি শুনতে পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, র‍্যাবের অভ্যন্তরে এ ধরনের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের সম্পূর্ণভাবে নিখোঁজ করে দেওয়াকে ‘এলিমিনেশন’ বা ‘গলফ্ট’ নামে উল্লেখ করা হতো।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার কয়েকদিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে সংবাদপত্রে জানতে পারেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সেটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের মরদেহ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এতে তার ধারণা হয়, পাথরঘাটার ওই অভিযানে নিহতদের একজন ছিলেন নজরুল। সাক্ষ্যের শেষাংশে মনিরুল হক অভিযোগ করেন, র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা প্রায়ই কমান্ড চেইন অমান্য করে সরাসরি ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা ও সদস্যদের নির্দেশ দিত, যা তার কাছে অপছন্দনীয় ছিল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন