অনলাইনে কোনো পণ্য কেনার জন্য আপনি ‘বাই’ বাটনে ক্লিক করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনার অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়ে যায়। আর সেই কাজের পেছনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চীনে তৈরি স্বয়ংক্রিয় রোবট। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হেফেই-এ অবস্থিত গিক প্লাস-এর কারখানায় তৈরি হচ্ছে এমন হাজার হাজার রোবট। এগুলো পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুদামে পাঠানো হচ্ছে। বিবিসি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পরিদর্শন করেছে। বৃটেনের অন্যতম বৃহৎ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান টেসকো, আসদা এবং নেক্সট ইতিমধ্যেই গিক প্লাসের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। রূপালি রঙের নিচু আকৃতির এই রোবটগুলো গুদামের তাকের নিচে ঢুকে পুরো তাকটি তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট কর্মীর কাছে পৌঁছে দেয়। গিক প্লাসের দাবি, এতে পণ্য বাছাইয়ের গতি বাড়ে। মানুষের নাগালের বাইরে থাকা জায়গাতেও বেশি পণ্য সংরক্ষণ করা যায়। ভুলের হার কমে যায়।
প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থার মতো এখানে স্থায়ী কনভেয়ার বেল্ট বা বড় অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। শুধু মেঝেতে কিউআর কোড চিহ্ন এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী বসিয়েই এই রোবট চালু করা যায়। ২০২৫ সালে হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর গিক প্লাস বিশ্বের সবচেয়ে বড় অটোনোমাস মোবাইল রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃটেনে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি দুর্বল। তাই ব্যবসাকে আরও দক্ষ করতে রোবটের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) তাদের ২০২৬ সালের ‘এসএমই টেকনোলজি অ্যাডপশন ইন দ্য ইউনাইটেড কিংডম’ প্রতিবেদনে বলেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে রোবট প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ওইসিডির মতে, শক্তিশালী শিল্প ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও বৃটেনে রোবট ব্যবহারের হার আশ্চর্যজনকভাবে কম। ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণে দেশটি এগিয়ে থাকলেও রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় তারা পিছিয়ে রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে গিক প্লাস। ইউরোপে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বাজার এখন বৃটেন। তাদের স্থানীয় অংশীদার মোশনটেক ইতিমধ্যে দেশটির ১০টি গুদামে ২ হাজারের বেশি রোবট স্থাপন করেছে। মোশনটেকের অ্যাকাউন্ট ডিরেক্টর ব্যারি পেম্বারটন বলেন, গ্রাহকরা দ্রুত স্থাপনযোগ্য সমাধান চান। তারা কম জায়গায় বেশি পণ্য, দ্রুত বাছাই এবং কম জনবল দিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে চান। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বৃটেনে শ্রমিকের বড় ঘাটতি রয়েছে। তাই ব্যবসা সচল রাখা এবং চাহিদা পূরণে এই প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৃটেনের প্রায় ৬০ লাখ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি) বলেছে, রোবট যেন শুধু কর্মী ছাঁটাইয়ের হাতিয়ার না হয়ে উৎপাদনশীলতা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত হয়। সরকারের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবন নীতির বিষয়ে দেয়া মতামতে টিইউসি বলেছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালুর সিদ্ধান্তে শ্রমিকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাদের মতে, প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা কর্মসংস্থান কমানোর বদলে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ঘোষিত ‘নিউ কোয়ালিটি প্রোডাকটিভ ফোর্সেস’ কৌশলের অধীনে রোবট প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। চীনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে এবং উৎপাদন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে বেইজিং। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যান বলেন, চীনের রোবট শিল্পের উত্থান সরাসরি বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য তৈরি ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, ক্যামেরা, সেন্সর ও সেমিকন্ডাক্টর এখন রোবট তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দুটি শিল্প একে অপরকে শক্তিশালী করছে।
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা এক্সপেং গত বছর তাদের মানবসদৃশ রোবট আয়রন উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হে শিয়াওপেং বলেন, আমরা আর এক্সপেংকে শুধু গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি না। ভবিষ্যতে প্রতিটি গাড়ি কোম্পানিই গাড়ি ও রোবট উভয় প্রযুক্তির কোম্পানিতে পরিণত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে যেমন দ্রুত বিশ্বনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে চীন, রোবট শিল্পেও একই পথ অনুসরণ করতে চায় দেশটি। অন্যদিকে ইলন মাস্ক-এর টেসলাও তাদের অপটিমাস মানবসদৃশ রোবট নিয়ে একই ধরনের পরিকল্পনা করছে। মাস্কের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এই রোবট ব্যবসা গাড়ি বিক্রির চেয়েও বড় হতে পারে।
