অস্কারজয়ী অভিনেতা ও থার্টি সেকেন্ডস টু মার্স ব্যান্ডের ভোকালিস্ট জ্যারেড লেটোর বিরুদ্ধে চারজন নারী ফৌজদারি যৌন অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত ঘটনাগুলো ঘটেছিল যখন তারা কিশোরী বয়সে ছিলেন। একজন নারীর অভিযোগ, ১৭ বছর বয়সে তিনি একটি মোটেলের বাথরুমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। আরেকজন জানান, ১৯ বছর বয়সে একটি হোটেল কক্ষে হঠাৎ একা রেখে যাওয়ার পর লেটো তাকে যৌন নির্যাতনের হুমকি দিয়েছিলেন। তৃতীয় একজন নারী বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৭ বছর বয়সে তার সঙ্গে যে যৌন সম্পর্ক হয়েছিল, তা মার্কিন আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্কের সাথে যৌন সম্পর্ক বা ‘স্ট্যাচুটরি রেপ’ হিসেবে গণ্য হতো। তার ভাষ্যমতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্মতির বয়স ১৮ বছর।
এই বিষয়ে কথা তুললে লেটো তা এড়িয়ে যান। চতুর্থ নারীর অভিযোগ, ১৬ বছর বয়সে লেটো তাকে বারবার যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ ফোন কল করে ‘গ্রুমিং’ করেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি নিজের তারকা-পরিচয়ের অপব্যবহার করেন। অন্তত একবার তিনি তাকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বলে তার দাবি। পরবর্তীতে তাকে একটি ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ (এনডিএ) পাঠানো হয়, যাতে তিনি লেটোর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা প্রকাশ করতে না পারেন। বিবিসি এই নথিটি দেখেছে বলে জানিয়েছে। তবে তিনি এতে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। আরও চারজন নারী জানান, কিশোরী বয়সে তারাও লেটোর কাছ থেকে অস্বাভাবিক ও প্রায়ই যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ ফোন কল পেতেন। একজন নারী অভিযোগ করেন, ১৪ বছর বয়সে এক সংগীত উৎসবে অটোগ্রাফ নেওয়ার সময় তার বুক নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করার পর লেটো নিরাপত্তারক্ষীকে নির্দেশ দেন তাকে মঞ্চের পেছনে নিয়ে যেতে। মেয়েটির মা এ বিষয়ে লেটোর কাছে গেলে লেটোও একই মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।
প্রামাণ্যচিত্রে ১০ নারীর সাক্ষ্য
মোট ১০ জন নারী বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র ‘জ্যারেড লেটো: হলিউডস ডার্ক সিক্রেট’ এ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন। সব নারীর দাবি, তাদের সঙ্গে লেটোর সাক্ষাৎ ঘটেছিল ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে, যখন লেটোর বয়স ছিল ৩০ ও ৪০-এর কোঠায়। বর্তমানে লেটোর বয়স ৫৪। একজন অভিযোগকারী বলেন, ঘটনার প্রায় ২৫ বছর পরও লেটো কোনো শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে গেছেন। বিবিসি জানিয়েছে, তারা কিছু নারীর বক্তব্য সংশ্লিষ্ট বন্ধু ও পরিবারের সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই করেছে, যারা সে সময়েই এসব ঘটনার কথা শুনেছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে বিবিসি প্রাসঙ্গিক ছবি ও বার্তাও দেখেছে। লেটো প্রায়শই কিশোরীদের গ্রিন রুমে বা রেকর্ডিং হচ্ছে এমন বাড়িতে ডেকে নিতেন। লেটোর ব্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা দুইজন পুরুষ কর্মী জানান, কিশোরী মেয়েদের সঙ্গে লেটোর এই সব আচরণ নিয়ে কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন অস্বস্তি ছিল। তাদের একজন বলেন, তারা লেটো ও যে সকল মেয়েদের সঙ্গে তিনি মিশতে চাইতেন তাদের বয়সের ব্যবধান নিয়ে প্রায় সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বিবিসি একাধিকবার লেটোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে লেটো দাবি করেন, তিনি জীবনে কখনও কারও ওপর যৌন হামলা চালাননি এবং অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।
অভিনয় ও সংগীত জীবন
১৯৯০-এর দশক থেকে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা জ্যারেড লেটো ২০১৪ সালে ‘ডালাস বায়ার্স ক্লাব’ ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা বিভাগে অস্কার জেতেন। ফাইট ক্লাব, ব্লেড রানার ২০৪৯, সুইসাইড স্কোয়াড এবং এবং সাম্প্রতিক মাস্টার্স অব দ্য ইউনিভার্সের মতো আলোচিত ছবিতেও তাকে দেখা গেছে। ১৯৯৮ সালে গঠিত তার ব্যান্ড থার্টি সেকেন্ডস টু মার্স আগামী বসন্তে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে সফরে যাচ্ছে, যেখানে লন্ডনের ও’টু এরিনা ও ম্যানচেস্টারের কো-অপ লাইভ এরিনায় কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ
লেটোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। বহু বছর ধরেই এসব অভিযোগ চলে আসছে। বিবিসির হিসাব অনুযায়ী, অনলাইনে তার আচরণ সংক্রান্ত ১২০টিরও বেশি পৃথক অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার কিছু বেশ পুরনো। গত বছর লস অ্যাঞ্জেলেসের একজন ডিজে সামাজিক মাধ্যমে ১৭ বছর বয়সে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলার পর আরও কয়েকজন নারী একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে সামনে আসেন। এছাড়া গত বছর মার্কিন সংবাদমাধ্যম এয়ার মেইলের এক প্রতিবেদনেও নয়জন নারী তার বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন, যা লেটো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
চার নারীর বিস্তারিত অভিজ্ঞতা
প্রামাণ্যচিত্রে যে চারজন নারী ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন, তাদের ছদ্মনাম ইসাবেল, অ্যালেক্স, ক্লারা ও এটা। তারা তাদের অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন বিবিসির প্রামাণ্যচিত্রে।
ইসাবেল: এখন চল্লিশোর্ধ্ব ইসাবেল জানান, ২০০২ সালে ১৭ বছর বয়সে ঘটা এই ঘটনার জন্য দীর্ঘদিন তিনি নিজেকেই দোষারোপ করতেন। লাস ভেগাসের যে দোকানে তিনি কাজ করতেন, সেখানে লেটো ও তার বন্ধুদের ঘুরিয়ে দেখানোর পর তাকে হোটেলে দেখা করার জন্য বলা হয়। কিন্তু ঠিকানাটি আসলে একটি নোংরা মোটেল বলে জানান তিনি। তার ভাষ্যমতে, লেটো তাকে বাথরুমে ডেকে নিয়ে শাওয়ারের পর্দা সরিয়ে চুমু খেতে শুরু করেন এবং তার হাত দিয়ে জোরপূর্বক নিজেকে স্পর্শ করান। ইসাবেল সরে যাওয়ার পর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে লেটো বাইরে গিয়ে আশপাশ পরীক্ষা করে তবেই তাকে যেতে দেন। পরে অনলাইনে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন লেটোর বয়স তখন ৩০-এর কোঠায় ছিল।
অ্যালেক্স: ২০১৩ সালে লন্ডনের ও২ এরিনায় ব্যান্ডের কনসার্টে সাবেক মডেল অ্যালেক্স আমন্ত্রিত হন। লেটোর সহকারী তাকে পরবর্তীতে একটি আফটার-পার্টিতে আমন্ত্রণ জানান। তখন ১৯ বছর বয়সী অ্যালেক্স নিজেকে রক্ষার জন্য লেটোকে বলেছিলেন তার বয়স ১৭। জবাবে ৪১ বছর বয়সী লেটো নাকি বলেছিলেন, বয়স স্রেফ একটি সংখ্যামাত্র। পরে একজন সহকারীর প্ররোচনায় তিনি একটি হোটেলে যান, যেখানে গিয়ে দেখেন সেখানে লেটো একা। ফোনের চার্জ ও টাকার অভাবে আটকে পড়া অ্যালেক্স যখন সোফায় ঘুমানোর অনুমতি চান, তখন লেটো আপত্তিকর ভাষায় তাকে যৌন নির্যাতনের হুমকি দেন বলে অভিযোগ। এরপরই তিনি নিরাপদ নন বুঝতে পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। সাবেক ক্রু সদস্য যাকে ‘ব্র্যাড’ নামে অভিহিত করা হয়েছে, তিনি জানান, কনসার্টের শেষ গানে তরুণীদের মঞ্চে ডাকা এবং পরে তাদের গ্রিন রুমে পাঠানোর নির্দেশ সরাসরি লেটোর কাছ থেকেই আসত।
ক্লারা: ক্লারার অভিযোগ, ২০০৬ সালে এক কনসার্টের ব্যাকস্টেজে লেটোর এক সহযোগী তার নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ায় লেটোর বাড়িতে ১৭ বছর বয়সে (তখন লেটোর বয়স ৩৪) তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয়। তার দাবি, লেটো তাকে ‘ড্যাডি’ বলে ডাকতে বলতেন এবং ছোট মেয়ের মতো ভান করতে বলতেন। সম্মতির বয়স নিয়ে আলোচনা হলেও লেটো তা গুরুত্ব দেননি বলে জানান তিনি। ক্লারা মোট তিন-চারবার লেটোর বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে জানান।
টেইলর: ২০০৫ সালে এক সংগীত উৎসবে মায়ের সঙ্গে ১৪ বছর বয়সী টেইলর লেটোর অটোগ্রাফ নিতে গিয়েছিলেন। শার্টে সই করার বদলে লেটো তার বুকের ওপর দিয়ে সই করেন এবং একটি আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ। এরপর তার অনুমতি না নিয়েই নিরাপত্তারক্ষীকে তাকে ব্যাকস্টেজে নিয়ে যেতে বলা হয়। মা প্রতিবাদ করলেও লেটো একই মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন বলে টেইলর জানান। তিনি বলেন, এই ঘটনার পর তার জীবন বদলে গিয়েছিল।
এটা: ২০১৪ সালে ১৬ বছর বয়সে একটি মডেলিং এজেন্সিতে মায়ের সঙ্গে গিয়ে এটার সঙ্গে লেটোর পরিচয় হয়। ইমেইল আদান-প্রদানের পরপরই ফোনে যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ প্রশ্ন করতে শুরু করেন লেটো, যদিও তিনি জানতেন এটার বয়স ১৬। এটার ভাষ্যে, লেটো তার নম্বর ‘ক্রিশ্চিয়ান’ নামের এক বন্ধুকে দেওয়ার কথা বলেন, যিনি পরবর্তীতে তাকে পর্নোগ্রাফি শুটের প্রস্তাব দেন এবং বয়স কোনো সমস্যা নয় বলে জানান। এটার সন্দেহ, লেটো নিজেই ভিন্ন পরিচয়ে এসব কল করতেন। ২০১৬ সালে লেটো তাকে জানান, তার আইনজীবী একটি এনডিএ পাঠাতে চান, কারণ তার নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আইনজীবী উদ্বিগ্ন, এই কথা বলার সময় লেটো হাসছিলেন।
(বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে। এতে ব্যবহৃত কিছু নাম ছদ্মনাম।)
